প্রাচীন ঐতিহ্যের নগরী সানআ
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইয়েমেনের রাজধানী সানআ-একটি শহর, যার শিকড় ইতিহাসের বহু গভীরে প্রোথিত। এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে অবস্থিত এই শহরটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় এর অবস্থান। ভৌগোলিকভাবে এটি ১৫°২১' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৪৪°১২' পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। বিশ্বের প্রাচীনতম অবিচ্ছিন্নভাবে বসবাসযোগ্য শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম সানআ, যার চারপাশে সৌদি আরব, ওমান, লোহিত সাগর ও আরব সাগরের বিস্তৃতি এ অঞ্চলকে দিয়েছে বিশেষ কৌশলগত গুরুত্ব। ইসলামের আগমনের বহু আগ থেকেই সানআ ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও ধর্মীয় কেন্দ্র। প্রাচীন দুর্গ ঘুমদান-এর স্থানে গড়ে ওঠা এই শহর একসময় আরব খ্রিস্টানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল।
একই সঙ্গে ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্যও এটি ছিল একটি প্রাণবন্ত আবাসভূমি। বাণিজ্যিক দিক থেকে সানআ ছিল আরব উপদ্বীপের অন্যতম কেন্দ্র। বর্তমানে শহরটিতে রয়েছে প্রায় ৪১টি ঐতিহ্যবাহী বাজার, যেখানে হস্তশিল্প, অলংকার থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পর্যন্ত সবকিছু পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, সানআর অনন্য স্থাপত্যশৈলী-বিশেষ করে নকশাকৃত বহুতল ঘরবাড়ি, সবুজ বাগান ও খোলা চত্বর-বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। এই অসাধারণ ঐতিহ্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কো সানাকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
সানআর জলবায়ু মূলত শুষ্ক প্রকৃতির। গ্রীষ্মকাল তুলনামূলক উষ্ণ হলেও শীতকালে তাপমাত্রা বেশ কমে যায়। তাপমাত্রা সাধারণত ৬°C থেকে ২৯°C -এর মধ্যে ওঠানামা করে।
ডিসেম্বর মাস সবচেয়ে ঠান্ডা, তাপমাত্রা নেমে আসে প্রায় ৬°C-এ। সানআ শহরটি মূলত নুকুম পর্বতমালার পশ্চিমে একটি বিস্তৃত সমভূমিতে গড়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক এই অবস্থান শহরটিকে দিয়েছে এক অনন্য সৌন্দর্য। তবে গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তরের দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং দ্রুত নগরায়ণের ফলে শহরের ভূগোলে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে আশির দশকে নগর বিস্তার আরও ত্বরান্বিত হয়।
এটি একটি শুষ্ক ও খরাপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় এখানকার কৃষি ও পশুপালন প্রধানত কূপের পানি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের ওপর নির্ভরশীল। সানআ শুধু একটি রাজধানী নয়-এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের জীবন্ত জাদুঘর। প্রাচীন ঐতিহ্য, প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত গুরুত্ব মিলিয়ে এই শহর আজও বিশ্বের কাছে এক বিস্ময়ের নাম।