অহংকার আর ঈমানের বাস্তব উপাখ্যান
মানবজীবনের এক অনিবার্য অংশ হলো, সম্পদ। যা মানুষকে উন্নতও করতে পারে, আবার ধ্বংসের দিকেও ঠেলে দিতে পারে। এই সত্যকে অত্যন্ত জীবন্ত ও হৃদয়স্পর্শীভাবে তুলে ধরা হয়েছে পবিত্র কোরআন-এর সুরা কাহাফ-এর ৩২ থেকে ৪৪ নম্বর আয়াতে। ‘দুই বাগানের মালিক’-এর এই কাহিনি। এটি শুধু একটি ঘটনা নয়। এটি মানুষের অন্তরের অবস্থা, বিশ্বাস ও পরিণতির এক গভীর প্রতিচ্ছবি। প্রথম জন, যাকে আল্লাহ অসাধারণ সম্পদ দান করেছিলেন। তার ছিল দুটি মনোমুগ্ধকর বাগান-আঙ্গুরের লতা, খেজুর গাছ, আর মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত নির্মল পানির ঝর্ণা। চারপাশে ছিল সবুজের সমারোহ, ফলের প্রাচুর্য, যেন পৃথিবীতেই এক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু এই প্রাচুর্য তাকে কৃতজ্ঞ বানায়নি। বরং সে অহংকারী হয়ে উঠেছিলো। তার চোখে সম্পদই ছিল সাফল্যের মাপকাঠি। সে তার অপর দরিদ্র সঙ্গীকে তুচ্ছ করে বলল, ‘আমি তোমার চেয়ে ধনে-সম্পদে বেশি এবং লোকবলেও শক্তিশালী।’ (সুরা: কাহাফ, আয়াত : ৩৪)
অন্যদিকে তার সঙ্গী, যদিও সম্পদে পিছিয়ে ছিল, কিন্তু ঈমানে ছিল দৃঢ়। সে বন্ধুকে অবজ্ঞা করেনি, বরং ভালোবাসা ও প্রজ্ঞা দিয়ে সতর্ক করেছিল। সে তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মানুষের সৃষ্টি, তার শক্তি, তার সম্পদ, সবই আল্লাহর দান। তাই অহংকারের কোনো স্থান নেই।
সে বলেছিল, ‘তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করেছিলে, তখন কেন বললে না, ‘এটা আল্লাহর ইচ্ছা, আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি নেই? (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৩৯)
কিন্তু অহংকার মানুষের চোখ অন্ধ করে দেয়। ধনী ব্যক্তি তার বন্ধুর কথা উপেক্ষা করল। সে এমনকি ভাবতে শুরু করল, এই বাগান কখনো ধ্বংস হবে না, আর কিয়ামত বলে কিছু নেই বা হলেও সে আরও ভালো কিছু পাবে! এই ঔদ্ধত্যের ফলাফল আসতে দেরি হলো না। একদিন হঠাৎ করে তার বাগান ধ্বংস হয়ে গেল, ফসল নষ্ট, গাছপালা উজাড়, সবকিছু নিঃশেষ। কোরআনের ভাষায়, ‘তার ফল-ফসল ধ্বংস হয়ে গেল, ফলে সে হাত মুচড়াতে লাগল।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৪২)
সেই মানুষ-ই, যার অহংকার একদিন আকাশ ছুঁয়েছিল, আজ অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নিজের ধ্বংসস্তূপের সামনে। সব ধ্বংস হয়ে নিঃশেষ হওয়ার পর সে তার চেতনা ফিরে পেল। সে উপলব্ধি করল, তার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আল্লাহকে ভুলে যাওয়া। সে তখন আর্তনাদ করে বলল, ‘হায়! আমি যদি আমার রবের সাথে কাউকে শরিক না করতাম!’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৪২)
কিন্তু এখন সেই অনুতাপ আর কোনো কাজে এলো না। তার সম্পদ, তার শক্তি, কিছুই তাকে রক্ষা করতে পারল না। সেই অবসহার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, ‘সেই অবস্থায় সাহায্য করার কেউ ছিল না আল্লাহ ছাড়া।’ (সুরা : কাহাফ, আয়াত : ৪৩)
এভাবে ‘দুই বাগানের মালিক’-এর এই কাহিনি আজও সমান প্রাসঙ্গিক। আধুনিক পৃথিবীতে আমরা প্রায়ই সম্পদ, ক্ষমতা বা সাফল্যের মোহে নিজেদের হারিয়ে ফেলি। আমরা ভুলে যাই, এই সবই সাময়িক, পরীক্ষামাত্র। কেননা, মানুষ যতই শক্তিশালী হোক, আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তার কিছুই নেই। আর সম্পদ নয়, কৃতজ্ঞতাই প্রকৃত সম্পদ। অহংকার নয়, বিনয়ই মানুষকে মহান বানায়। দুনিয়া নয়, আখিরাতই চূড়ান্ত গন্তব্য। তাই জীবনের প্রতিটি প্রাপ্তিতে আমাদের বলা উচিত, ‘মাশাআল্লাহ, লা হাওলা ওলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।’ কারণ শেষ পর্যন্ত, সবকিছু হারিয়ে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস থাকলে মানুষ কখনো সত্যিকার অর্থে নিঃস্ব হয় না।