নবী-রাসুল প্রেরণের মৌলিক উদ্দেশ্য
মহান আল্লাহ যুগে যুগে মানবজাতির দিকনির্দেশনা, হেদায়েত ও সত্যপথ প্রদর্শনের জন্য প্রেরণ করেছেন নবী ও রাসুলগণকে। তাঁদের মাধ্যমেই মানুষ জেনেছে সৃষ্টিকর্তাকে, শিখেছে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য, পেয়েছে আলোকিত জীবনের পথনির্দেশ। নিচে তাঁদের প্রেরণের মৌলিক উদ্দেশ্য তুলে ধরা হলো—
তাওহিদ ও আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা
নবী-রাসুল প্রেরণের মূল উদ্দেশ্য ছিল তাওহিদের দাওয়াত—অর্থাৎ আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস স্থাপন ও তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা। আল্লাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যেক উম্মতের মধ্যে একজন রাসুল পাঠিয়েছি এই বলে, আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুত থেকে দূরে থাকো...।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৩৬)
ন্যায় ও মানবতা প্রতিষ্ঠা
নবী-রাসুলদের আরেকটি প্রধান দায়িত্ব ছিল মানব সমাজে ন্যায়, সুবিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা। মানুষ যখন অত্যাচার, অন্যায়, দুর্নীতি ও অমানবিকতায় নিমজ্জিত হতো, তখন আল্লাহ তাঁদের পাঠাতেন সংস্কারক হিসেবে। কুরআনে বলা হয়েছে, ‘আমি রাসুলদের সুস্পষ্ট প্রমাণসহ পাঠিয়েছি এবং তাঁদের সঙ্গে নাযিল করেছি কিতাব ও মিজান, যাতে মানুষ ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে।’ (সুরা হাদিদ, আয়াত : ২৫)
নবীরা শুধু ধর্মীয় উপদেশই দেননি; বরং একটি সুশৃঙ্খল সমাজ গড়ার দিকনির্দেশও দিয়েছেন। তাঁরা শিখিয়েছেন—সত্যবাদিতা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, দয়া, সহমর্মিতা, পরোপকারিতা—এসব ঈমানের অঙ্গ।
মানুষকে পথভ্রষ্টতা থেকে রক্ষা
মানুষের মনে আছে প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনা। যদি আল্লাহর বার্তাবাহক না থাকতেন, তবে মানুষ সম্পূর্ণরূপে বিভ্রান্তির পথে চলে যেত। নবী-রাসুলগণ এই বিভ্রান্তি থেকে মানুষকে রক্ষা করেছেন, তাঁদের সতর্ক করেছেন আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে এবং দেখিয়েছেন জান্নাতের পথ। আল্লাহ বলেন—‘রাসুলদের প্রেরণ করেছি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে, যাতে মানুষের কোনো অজুহাত না থাকে আল্লাহর বিরুদ্ধে।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ১৬৫)
আল্লাহর বিধান ব্যাখ্যা ও বাস্তব রূপদান
আসমানি কিতাবগুলোতে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ রয়েছে, কিন্তু তা ব্যাখ্যা ও বাস্তব জীবনে প্রয়োগের শিক্ষা দিয়েছেন নবী-রাসুলরা। তারা আল্লাহর আইনকে কেবল প্রচার করেননি; বরং নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। নবী করিম (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন—‘আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তা ব্যাখ্যা করে দাও যা তাদের প্রতি নাজিল করা হয়েছে।’ (সুরা নাহল, আয়াত : ৪৪)
আখিরাত ও জবাবদিহির বোধ সৃষ্টি
মানুষ প্রায়ই ভুলে যায়, এ জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং মৃত্যুর পর আছে এক অনন্ত জগৎ—আখিরাত। নবীরা মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, এই পৃথিবী পরীক্ষার ময়দান; এখানে করা প্রতিটি কাজের হিসাব দিতে হবে আল্লাহর কাছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে কেউ অণু পরিমাণ সত্কর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে; আর যে কেউ অণু পরিমাণ অসত্কর্ম করবে, সেও তা দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)
নবীরা এই জবাবদিহিতার বিশ্বাস মানুষের মনে গেঁথে দিয়েছেন। ফলে মানুষ অন্যায়ের ভয় করে, ন্যায়ের প্রতি অটল থাকে এবং আত্মসংযমী হয়।
মানবজাতির ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা
নবী-রাসুলদের দাওয়াতের আরেকটি দিক ছিল মানবজাতিকে বিভক্তি থেকে মুক্ত করে এক ঈমানি পরিবারে পরিণত করা। তাঁরা শিখিয়েছেন—সব মানুষ আদমের সন্তান, কেউ কারও চেয়ে শ্রেষ্ঠ নয়, শ্রেষ্ঠতা কেবল তাকওয়ার মাধ্যমে। নবী করিম (সা.) বলেন, ‘কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো অনারবের ওপর আরবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই, যদি না তা তাকওয়ার মাধ্যমে হয়।’ (মুসনাদ আহমদ)
এই শিক্ষা বিশ্বমানবতাকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে। নবীদের লক্ষ্য ছিল মানুষের মধ্যে হিংসা, ঘৃণা ও শ্রেণিবৈষম্য দূর করা, যাতে সবাই আল্লাহর বান্দা হিসেবে শান্তিতে বসবাস করতে পারে।
জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা
নবী-রাসুলরা কেবল ধর্মীয় আচার শেখাননি; তাঁরা জীবন পরিচালনার পূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কিভাবে পরিবার গড়া যাবে, কেমন হবে ব্যবসা-বাণিজ্য, শাসন, শিক্ষা, ন্যায়বিচার, এমনকি যুদ্ধ ও শান্তির নীতি—সব কিছুই তাঁরা দেখিয়েছেন। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন হচ্ছে পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান—যা ইবাদত থেকে রাজনীতি, পরিবার থেকে রাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত সর্বত্র দিকনির্দেশনা দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের জীবনে আছে উত্তম আদর্শ, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের আশা রাখে।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ২১)