বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

মানতের সদকা যেভাবে দিতে হয়

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন 09 ফেব্রুয়ারি 2022, 10:58 দুপুর 1,460 বার পঠিত
মানতের সদকা যেভাবে দিতে হয়

আমাদের দেশের মানুষ সাধারণত মসজিদে টাকা দেওয়ার মানত করে থাকে। কিন্তু মাসআলা হলো, মসজিদে টাকা দেওয়ার মানত করলে মানত হয় না। তবে কারো যদি এই উদ্দেশ্য থাকে যে, তিনি তার টাকা দিয়ে মসজিদের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো জিনিস কিনে তাতে ওয়াকফ্ করবেন, তাহলে মানত শুদ্ধ হবে।

আমার পরিবারের সদস্যদেরকেও দেখেছি, ঘরে কোনো অসুখবিসুখ হলে মানত করেন এবং জুমার দিন মসজিদের দানবক্সে মানতের সদকা দান করেন। হ্যাঁ, কেউ যদি মসজিদে দান করার মানত করে, তাহলে যদিও তার মানত সহিহ হবে না। কিন্তু সতর্কতার দাবি হবে, মসজিদে সেই পরিমাণ টাকা দান করে দেওয়া।

মানত করার জন্য মুখে উচ্চারণ করা জরুরি। অন্তরের নিয়ত দ্বারা মানত হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের অনেকেই অন্তরে অন্তরে মানত করেন। যেমনিভাবে শুধু নিয়ত করার দ্বারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নামাজ বা রোজা আদায় হয়ে যায় না, তেমনি শুধু নিয়তের দ্বারা মানতও হবে না, যাবৎ না মুখে উচ্চারণ করা হয়।

মানত দু’ভাবে করা যায়। শর্তযুক্ত কিংবা শর্তমুক্ত মানত করা যায়। শর্তমুক্ত মানত যেমন—আমি মানত করছি, আমি এবার শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখবো/আমি নিজের ওপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা অবধারিত করলাম। আর শর্তযুক্ত মানত যেমন—আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ করেন/আমাকে অমুক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার তাওফিক দান করেন, তাহলে আমি এতোদিন রোজা রাখবো/এতো পারা কোরআন পড়বো/এতো টাকা সদকা করবো।

শর্তমুক্ত মানত করার প্রচলন এ দেশে তেমন নেই। অথচ শর্তমুক্ত মানত করে কোনো ইবাদত করলে দু’সাওয়াব— ইবাদতের সাওয়াব এবং মানত পূরণের সাওয়াব পাওয়া যায়। অবশ্য এটাও স্মরণ রাখা উচিত যে, মানত করার দ্বারা মানতকৃত বিষয়টি ওয়াজিব হয়ে যায়। তাই এভাবে মানত করলে শুধু সে বিষয়েরই মানত করা উচিত, যা আদায় করা সম্ভব হবে এবং তখনই করা উচিত, যখন তা আদায়ের পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবার শঙ্কা না থাকবে।

আর শর্তযুক্ত মানত করা একটি অনুচিত কাজ। কেননা শর্তযুক্ত মানতে বিষয়টা এমন হয়ে থাকে— আল্লাহ, যদি তুমি আমার লক্ষ্য পূরণ করো, তাহলে আমি এই ইবাদত করবো। আর যদি তা না করো, তাহলে কিন্তু আমার এই ইবাদত তুমি পাবে না। শায়খ উসমানি রহ. এর ভাষায়— কেমন যেনো আল্লাহর সঙ্গে সওদাবাজি করা হচ্ছে। এই প্রকারের মানত কোনো পূণ্যের কাজ নয়। হাঁ, এর কারণে অবশেষে যে ইবাদত করা হয়, তা অবশ্য কিছু সওয়াব বয়ে আনে। তবে এরচে বহুগুণ উত্তম, শর্তযুক্ত মানত না করে সরাসরি আল্লাহর রাস্তায় সদকা করে দেওয়া বা অন্য কোনো ইবাদত সম্পন্ন করে ফেলা। এর বরকতে আল্লাহ তাআলা ইনশাআল্লাহ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূর্ণ করবেন, বিপদ-আপদ দূর করবেন।

হাদিস শরীফে এসেছে—আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আমাদেরকে মানত করতে নিষেধ করলেন। তিনি তখন বলেছেন, মানত কোনো কিছুকে ফেরাতে পারে না। তবে মানতের মাধ্যমে কৃপণ ব্যক্তির সম্পদ বের করা হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩২৫)

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা মানত করবে না। কেননা মানত তাকদিরের কোনো কিছুকে ফেরাতে পারে না। এর দ্বারা শুধু কৃপণ ব্যক্তি থেকে সম্পদ বের হয়। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম, হাদীস নং ৪৩২৯, সুনান তিরমিজি, সুনান নাসায়ি)

তিনি আরো বলেন, রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, মহান আল্লাহ যে জিনিসকে আদম সন্তানের জন্য নির্ধারণ করেননি, মানত সেটি তার নিকটবর্তী করে না। বরং তাকদীরে যা আছে মানত তা-ই নিয়ে আসে। এর মাধ্যমে কৃপণ ব্যক্তির সম্পদ বের করা হয়, যা সে খরচ করতে চায়নি। (সহিহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩৩১)

শর্তযুক্ত মানত দু’ধরনের হতে পারে—

এক. মানতকারী মানতের সঙ্গে এমন শর্ত যুক্ত করেছে, যা পূরণের প্রত্যাশা সে রাখে। যেমন সে মানত করলো যে, আল্লাহ যদি আমাকে অমুক প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য করেন, তাহলে আমি দশ রাকাত নফল নামাজ আদায় করবো। এখানে দশ রাকাত নফল নামাজকে সে ভর্তি পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার শর্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে। আর স্পষ্ট যে, এটা এমন শর্ত, যা পূরণ হওয়ার প্রত্যাশা সে রাখে।

দুই. মানতের সঙ্গে সে এমন শর্ত যুক্ত করেছে, যা পূরণ হওয়ার প্রত্যাশা আদৌ সে রাখে না। যেমন সে মানত করলো যে, আল্লাহ যদি এই মিশনটি শেষ করার আগে আমাকে কোনো দুর্ঘটনায় ফেলেন, তাহলে আমি লাগাতার চার মাস রোজা রাখবো। তেমনি কোনো ভালো মানুষ মানত করলো যে, আমার দ্বারা যদি কখনো কোনো কবিরা গুনাহ হয়ে যায়, তাহলে আমি প্রতিটি গুনাহের জন্য নফল সদকা করবো। এখানে লাগাতার চার মাস রোজা রাখা এবং নফল সদকা করাকে মানতকারী এমন শর্তের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা সংঘটিত হওয়াটা তার প্রত্যাশা নয়।

প্রথম প্রকার মানতের ক্ষেত্রে মানতকারীর জন্য শর্ত পূরণ হওয়ার পর তার কৃত মানত পূরণ করা ওয়াজিব। এক্ষেত্রে মানত পূরণ না করে কাফফারা দেওয়া যথেষ্ট নয়। যতো কষ্টই হোক, তাকে তার মানত পূরণ করতেই হবে। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় প্রকারের মানতের ক্ষেত্রে মানতকারী শর্ত পূরণ হওয়ার পর তার কৃত মানতও পূরণ করতে পারে, আবার চাইলে কাফফারাও আদায় করতে পারে। এককথায়, প্রথম প্রকার মানতের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সামনে একটাই অপশন, আর তা হলো কৃত মানত পূরণ করা আর দ্বিতীয় প্রকার মানতের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সামনে দু’টো অপশন। এবার সে দু’টোর মধ্য থেকে যে-কোনোটাকে গ্রহণ করতে পারে।

এই মাসআলাটি ইমাম আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণিত। আল্লামা শামির ভাষ্যানুযায়ী ইন্তিকালের মাত্র সাতদিন পূর্বে তিনি এই অভিমত প্রদান করেছেন। হিদায়া গ্রন্থে রয়েছে, এটি ইমাম মুহাম্মাদ রহ. এরও মত এবং এটাই বিশুদ্ধ মতো। মাযহাবের মুতুন-প্রণেতাগণও এই অভিমত গ্রহণ করেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. এরও মাযহাব এটা। ফাতহুল কাদির গ্রন্থে বলা হয়েছে, এই মতটি ‘নাদিরুর রিওয়ায়াহ’, তবে মুহাক্কিকগণ এই মতটিকেই গ্রহণ করেছেন।