ইরানে শিয়া মতবাদের উত্থান যেভাবে
আজকের ইরানের দিকে তাকালে অনেকের মনে হতে পারে হয়ত এখানেই শিয়া মতবাদের জন্ম ও বিকাশ ঘটেছে। ইরানই হয়ত শিয়া মতবাদের প্রাচীনতম কেন্দ্র। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাঁচ শ বছর আগেও ইরান ছিল সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চল। সাফাভিদ শাসকদের আমলে ইরানে শিয়া মতবাদের উত্থান ঘটে। এরপর ক্রমন্বয়ে ইরানে এই মতবাদ শক্তিশালী হতে থাকে, যার চূড়ান্ত রূপ ইরানের সর্বশেষ ইসলামী বিপ্লব।
ইসলামপূর্ব ইরান ছিল জরাথুস্ট্র ও মানি ধর্মের অনুসারী। ইরান তথা পারস্যের বেশির ভাগ মানুষ পৌত্তলিকতায় বিশ্বাসী ছিল। ২১ হিজরি মোতাবেদ ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানদের হাতে প্রাচীন ইরান বা পারস্যের পতন ঘটে। এরপর থেকে ১৫০১ খ্রিস্টাব্দে সাফাভিদ শাসন প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত সাড়ে আট শ বছর ইরানে সুন্নি মুসলিমরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। সুন্নি অধ্যুষিত ইরানে মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্বরা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। যাদের মধ্যে ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিজি, ইমাম নাসায়ি, ইমাম আবু হানিফা, ইমাম ইবনে খুজাইমা ও ইমাম সিবওয়াইহ (রহ.)-এর মতো কালজয়ী আলেমরাও আছেন। তখন ইরানে শিয়াদের উপস্থিতি ছিল বর্তমান আরব রাষ্ট্রে শিয়াদের মতো। তারা ছিল ছড়ানো ছিটানো একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। ইরানে শিয়া মতবাদের উত্থানের পেছনে বেশ কিছু ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও ভৌগলিক কারণ আছে।
মুসলমানদের হাতে পারস্যের পতনের আগে ইরান ছিল পৃথিবীর অন্যতম পরাশক্তি। পারস্যের লোকেরা হাজার বছর ধরে এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল শাসন করেছে। আরব মুসলিমরা পারস্য জয় করার বিজয়ীদের ধর্ম হিসেবে অনেকে ইসলামে দীক্ষিত হলেও তাদের মনে পুরাতন জাত্যভিমান ঠিকই জাগ্রত ছিল। ফলে তারা অনেক ক্ষেত্রেই জাজাবর আরবদের শাসন পছন্দ করত না। বিশেষ করে, উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে পারস্যবাসীর বেশ অসন্তোষ ছিল। তারা মনে করত, জ্ঞান, যোগ্যতা ও প্রাশাসনিক দক্ষতার অগ্রগামী হওয়ার পরও তারা আরবদের সমমর্যাদা পাচ্ছে না। উমাইয়া আমলে আরবিকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে গ্রহণ করলে পারস্যের অধিবাসীরা আরো ক্ষুব্ধ হন। ফলস্বরূপ উমাইয়া শাসনের অবসান ও আব্বাসীয়দের উত্থানে পারস্যবাসী বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে আবু মুসলিম খোরাসানির অবদান ছিল ঐতিহাসিক। উমাইয়া শাসনের বিরুদ্ধে পারস্যের ক্ষোভ তাদেরকে আলী (রা.), আহলে বাইত ও শিয়া মতবাদের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। উমাইয়া শাসনামলের শুরুতে সংঘটিত কারবালার ঘটনা শিয়া মতবাদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দর্শন তৈরিতে তাত্পর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এখনো শিয়া মতাবলম্বীরা কারবালার ঘটনাকে পরম গুরুত্বের সঙ্গে স্মরণ করে।
আব্বাসীয় রাজদরবারে পারস্যবাসীর বিশেষ মূল্যায়ন ছিল। তারা আব্বাসীয় খেলাফতের অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হয় এবং খলিফার দরবারে প্রভাব বিস্তার করে। তবুও আরব বংশোদ্ভূত আব্বাসীয়দেরকে ইরানিরা কখনো স্বজাতির শাসন হিসেবে দেখেনি, তারা তাদেরকে ভিনদেশী দখলদার জ্ঞান করত, বরং বলা যায়, এখনো ইরানের লোকেরা উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনকে ভিনদেশীদের শাসন হিসেবেই দেখে এবং তারা সাফাভিদ শাসনকে স্বশাসন বলতে পছন্দ করে। সম্প্রতি ইরান সরকারের সহায়তায় পরিচালিত পার্স টুডের এক প্রতিবেদনে বিষয়টি ফুটে উঠেছে, ‘ইরানে বিদেশীদের শাসনের আট শ’ বছর পর সাফাভিরা পুনরায় ইরানের নিজস্ব ঐতিহ্য ও পরিচয়কে জাগিয়ে তোলেন।’ (প্রবন্ধ : ইরানে শিয়া মাজহাবকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দান)
সাফাভি শাসকরা ইরানবাসীর এই স্বদেশ চেতনা ও আরব সুন্নি শাকদের বিরুদ্ধে তাদের সুপ্ত ক্ষোভের রাজনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করে। তারা প্রতিদ্বন্দ্বী সুন্নি শাসকদের বিরুদ্ধে শিয়া মতবাদকে জাতীয়তাবাদের বাহক হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের শাসনকে সুসংহত করে। সাফাভি শাসক শাহ প্রথম ইসমাইল ১৫২৪ খ্রিস্টাব্দে শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। সাফাভি শাসকরা এই মতবাদকে ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়োজনীয় সবকিছুই করে। তারা ইরানে শিয়া মতবাদকে ধর্মীয় ও তাত্ত্বিক রূপ দিতে শিয়া ধর্মবেত্তাদের ইরানে আমন্ত্রণ করেন। বিশেষত বাহরাইন ও লেবাননের শিয়া আলেমদের ইরানে নিয়ে আসে। এই সময় আরব উপদ্বীপ, মধ্যএশিয়া ও ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শিয়া মতাদর্শী মানুষ ইরানে পাড়ি জমায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় শিয়া মতবাদের ওপর অসংখ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। অন্যদিকে সুন্নিদের বিরুদ্ধে তারা চরম দমন-চালায় বলেও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সমকালীন একাধিক ঐতিহাসিক দাবি করেছেন, সাফাভিরা সুন্নিদের সামনে কেবল দুটি অবকাশই রেখেছিলেন। তা হলো, ধর্মান্তর বা দেশান্তর। এই সময় সুন্নি মুসলিমরা প্রতিবেশী সুন্নি অধ্যুষিত অঞ্চলে হিজরত করে। সাফাভি শাসকদের হাতে বহু সুন্নি আলেম ও সাধারণ মুসলমান নিহত হয় বলে ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। সুন্নিদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদরাসাগুলো ধ্বংস করা হয়। ধারাবাহিক রূপান্তর চেষ্টা ও দেশান্তরের ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নিরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। একইভাবে ধর্মীয় বিবর্তনের মাধ্যমে সাফাভিদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক রজার মার্ভেন সভেরি বলেন, ‘সাফাভিদের দ্বারা শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক ধর্ম হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার ফলে জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে বৃহত্তর সচেতনতা তৈরি হয়েছিল এবং এর ফলস্বরূপ একটি আরো শক্তিশালী ও কেন্দ্রীভূত সরকার গঠিত হয়েছিল।’
সাফাভি শাসকদের সবাই ধারাবাহিকভাবে শিয়া মতবাদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তারা সবাই শিয়া মতবাদের প্রতি আনুগত্যকে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা করেছিলেন। এর মধ্যে শাহ আব্বাস শিয়া রূপান্তরে বিশেষ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। তিনি সব ধরনের ভিন্ন মতাবল্বীদের উচ্ছেদ করেন এবং শহরের প্রধান কাজি থেকে শুরু করে গ্রামের মসজিদের ইমাম পর্যন্ত সর্বত্র শিয়াদের পদায়ন করেন। আবার ধর্মীয় পদগুলোকে রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক পদের অধীন করা হয়েছিল। যেমন মন্ত্রীসভার সর্বোচ্চ ধর্মীয় পদ ছিল সদর। যার দায়িত্ব ছিল শিয়া মতবাদ প্রচার, ধর্মীয় ওয়াকফ সম্পত্তির পরিচালক, প্রধান প্রধান শহরের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ নিয়োগ এবং সৈয়দদের প্রধান নিয়োগ দেওয়া। সাফাভিদের পর কাজাররাও শিয়া মতবাদ প্রসারে পৃষ্ঠপোষকতা করে, বরং তারা শিয়া মতবাদকে একটি রাজনৈতিক মতাদর্শে রূপ দেয়। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় শিয়া মতবাদকে রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করে। শিয়া ধর্মীয় নেতারা এবং তাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এই সময়ে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে
ধারাবাহিক পীড়ন ও অত্যাচারের মধ্যেও ইরানে এখনো একদল সুন্নি মুসলমান টিকে আছে। সুন্নিদের বেশির ভাগ ইরানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে। সমকালীন পরিদর্শন অনুসারে ইরানের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ সুন্নি