হজের বহুমুখী উপকারিতা ও তাত্পর্য
ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে হজ একটি অনন্য ইবাদত, যা শারীরিক ও আর্থিক ইবাদতের এক অপূর্ব সমন্বয়। প্রতি বছর জিলহজ মাসে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসলিম মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মক্কার পবিত্র ভূমিতে সমবেত হন। হজ কেবল একটি সফর নয়, বরং এটি মুমিনের আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর প্রতি অগাধ প্রেম এবং বিশ্ব মুসলিমের ঐক্যের এক জীবন্ত মহড়া।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা হজের গুরুত্ব ঘোষণা করে বলেন, ‘আর মানুষের মধ্যে হজের ঘোষণা দাও; তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটসমূহের পিঠে সওয়ার হয়ে, তারা আসবে দূর-দূরান্তের পথ অতিক্রম করে।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ২৭)
হজের উপকারিতা ও নেয়ামতরাজি অপরিসীম। নিচে হজের বহুমুখী কল্যাণসমূহ আলোচনা করা হলো,
১. ইসলামের স্তম্ভ পূর্ণ হওয়া ও গুরুদায়িত্ব থেকে দায়মুক্তি
হজ ইসলামের অন্যতম ভিত্তি। একজন সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য জীবনে একবার হজ করা ফরজ।
হজের মাধ্যমে বান্দা তার ওপর অর্পিত মহান রবের একটি বড় হুকুম পালন করে এবং আখিরাতের জবাবদিহিতা থেকে দায়মুক্তি লাভ করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি স্তম্ভের ওপর, এই সাক্ষ্য দেওয়া যে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রাসূল, নামাজ কায়েম করা, জাকাত দেওয়া, হজ করা এবং রমজানের রোজা রাখা। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬)
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যারা হজ করে না, তাদের ব্যাপারে শরিয়তে কঠোর হুঁশিয়ারি এসেছে। তাই হজ আদায়ের মাধ্যমে মুমিন আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত গুরুদায়িত্ব পালনের প্রশান্তি লাভ করে।
২. জীবনের সব গুনাহ থেকে মুক্তি ও পবিত্রতা লাভ
হজের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক পাওয়া হলো গুনাহ থেকে মুক্তি। ইখলাসের সাথে বা মাবরুর হজ আদায়কারী ব্যক্তির আগের সকল পাপ আল্লাহ ক্ষমা করে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই মহামুক্তির ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং তাতে কোনো প্রকার অশ্লীল কথা বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হলো না, সে হজ থেকে এমনভাবে ফিরে আসবে যেন আজই তার মা তাকে প্রসব করেছেন (অর্থাত্ সে নবজাতক শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যাবে)।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৫২১)
অন্য এক হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কবুল হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৭৭৩)
এই নিষ্পাপ হওয়ার অনুভূতি একজন মুমিনকে নতুনভাবে জীবন শুরু করার প্রেরণা দেয়।
৩. আল্লাহর প্রেমে পার্থিব মায়া ত্যাগ ও অবিচ্ছেদ্য মহব্বত সৃষ্টি
হজ হলো প্রেমের সফর। হাজি সাহেব যখন নিজের ঘর-বাড়ি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রিয় পরিজনের মায়া ত্যাগ করে কেবল ‘লাব্বাইক’ ধ্বনি দিয়ে মরুভূমির তপ্ত বালুতে পা রাখেন, তখন তার হূদয়ে আল্লাহর প্রতি এক গভীর ও অবিচ্ছেদ্য ভালোবাসা তৈরি হয়। ইহরামের দুই টুকরো সাদা কাপড় পরার মাধ্যমে সে প্রমাণ করে যে, তার কাছে স্রষ্টার চেয়ে বড় আর কেউ নেই। এই ত্যাগের মহিমা তাকে দুনিয়াবি আসক্তি থেকে মুক্ত করে আল্লাহর পরম সান্নিধ্যে নিয়ে যায়। এই সফর মুমিনকে শেখায় যে প্রকৃত ঘর হলো আখেরাত এবং প্রকৃত বন্ধু হলেন আল্লাহ।
৪. আল্লাহর হুকুমের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ
হজের প্রতিটি কাজ, তাওয়াফ করা, সাফা-মারওয়া দৌড়ানো, শয়তানকে পাথর মারা বা আরাফাতের ময়দানে দাঁড়িয়ে থাকা এসবের পেছনে নিহিত আছে ইবরাহিম (আ.) ও তাঁর পরিবারের চরম ত্যাগের ইতিহাস। অনেক ক্ষেত্রে এসব কাজের বাহ্যিক যুক্তি মানুষের বুঝে না আসলেও একজন মুমিন কেবল আল্লাহর নির্দেশ মনে করে তা পালন করে। এই নিঃশর্ত আনুগত্যই হলো হজের শিক্ষা। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ কেবল বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ১৬২)
হজ মুমিনের মনে এই প্রেরণা জাগ্রত করে যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজের মর্জির চেয়ে আল্লাহর মর্জির গুরম্নত্ব অনেক বেশি।
৫. দারিদ্র্য বিমোচন ও রিজিকে বরকত লাভ
অনেকে মনে করেন হজে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়, যা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। কিন্তু নবীজি (সা.)-এর শিক্ষায় এর উল্টো সুসংবাদ আছে। তিনি ইরশাদ করেছেন, তোমরা হজ ও ওমরাহ পরপর আদায় করো; কেননা এ দুটি ইবাদত দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন কামারের হাপর লোহার মরিচা দূর করে দেয়। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৮১০; সুনানে নাসাঈ, হাদিস : ২৬৩১)
হজ আদায়কারীর অন্তরে যেমন আল্লাহ সচ্ছলতা দান করেন, তেমনি তার রিজিকেও বিশেষ বরকত দান করেন। এটি আল্লাহর এক কুদরতি ব্যবস্থা যে হজ পালনকারী ব্যক্তি কখনো নিঃস্ব হয় না।
৬. বিনয় সৃষ্টি ও অহংকার মুক্তি
হজের অন্যতম বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উপকারিতা হলো বিনয় শিক্ষা। ইহরামের সাদা পোশাকে বাদশাহ আর ফকিরের মাঝে কোনো তফাত থাকে না। সবাই এক পোশাকে, এক রবের দরবারে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দৃশ্য মুমিনের অন্তরের রাজকীয় অহংকার, বংশীয় গৌরব এবং আভিজাত্যের দম্ভ ধুয়েমুছে সাফ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাবান, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকি (পরহেজগার)।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১৩)
হজের প্রতিটি কদম বান্দাকে শেখায় যে মৃত্যুর পর সাদা কাফনই হবে শেষ সম্বল, তাই দুনিয়াতে বিনয়ী হওয়াই শ্রেয়।
৭. বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও দ্বীনি জ্ঞান অর্জন
হজ হলো বিশ্ব মুসলিমের মহাসম্মিলন। বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ যখন এক স্থানে মিলিত হয়, তখন ইসলামের সার্বজনীন ভ্রাতৃত্বের এক অনুপম রূপ ফুটে ওঠে। আল্লাহ তাআলা হজের উপকারিতা সম্পর্কে বলেন, ‘যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে।’ (সুরা হজ, আয়াত : ২৮)
মুফাসসিরগণের মতে, এই ‘কল্যাণ’ যেমন আখেরাতের, তেমনি দুনিয়াবিও। হজের সফরে বড় বড় আলেম ও ফকিহদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়, যা দ্বিনের সঠিক জ্ঞান ও হজের মাসায়েল সম্পর্কে গভীর অনুধাবন সৃষ্টিতে সাহায্য করে। বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান মুসলিম উম্মাহর ঐক্যকে সুদৃঢ় করে।
পরিশেষে বলা যায়, হজ কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি মুমিনের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক বিপ্লবী ইবাদত। হজের মাধ্যমে একজন মানুষ যেমন আধ্যাত্মিকভাবে বলীয়ান হয়, তেমনি সামাজিকভাবেও উদার ও বিনয়ী হয়ে ওঠে। হজের এই সাতটি উপকারিতা মুমিনের ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির রক্ষাকবচ।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সব সামর্থ্যবান মুসলিমকে কবুল হজ নসিব করুন এবং হজের এই শিক্ষাগুলো সারা জীবন লালন করার তাওফিক দান করুন।