বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

গফরগাঁওয়ে ইসলাম

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন 04 মে 2026, 09:52 সকাল 95 বার পঠিত
গফরগাঁওয়ে ইসলাম

ময়মনসিংহের গফরগাঁও, সারাদেশে অনেকটা স্বনামেই পরিচিত। দরবেশ গফরশাহের নামানুসারে নামকরণকৃত গফরগাঁওয়ে রচিত হয়েছে মুসলিম ঐতিহ্যের সোনালি অধ্যায়। 

১৩৯২ সালে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজমশাহের শাসনামলে জানে আলম খানের নেতৃত্বে এ অঞ্চলে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন হয়। রাজধানী ছিলো বর্তমান দিঘিরপাড় গ্রামে।

শাহজালালের (রহ.) সহচর মিসকিনশাহ গফরগাঁওয়ের মূখী ও পার্শ্বর্বর্তী এলাকায় ইসলাম প্রচারে আদিষ্ট হন এবং এখানেই তার মাজার। 

টাঙ্গাইলের গরিবুল্লাহ শাহ, নেত্রকোনার মদনপুরের শাহ সুলতান (রহ.)-এর ভক্ত। তিনি খিলাফতপ্রাপ্ত হয়ে মিসকিনশাহর মাজারে সাধনা করেন। তিনি গফরগাঁওয়ের পাঁচুয়া গ্রামে ইন্তেকাল করেন। সেখানেই তার মাজার। 

কিংবদন্তী হলো: ষোড়শ শতকে সেকান্দরশাহের পুত্র ফরিদশাহ, কালুশাহ, মানিকশাহ। ফরিদশাহর আস্তানা ছিলো দত্তের বাজার ইউনিয়নের ফরিদপুরে, তিনি সেখানে পুকুর খনন করেন। কালুশাহ মাইজবাড়িতে চৌদ্দ একর জমিজুড়ে পুকুর খনন করেন। এটাই কালুশাহর দীঘি। কালুশাহ দিল্লির সুলতানের আনুগত্য অস্বীকার করেন। সুলতানের সঙ্গে লড়াইয়ে তিনি শহিদ হলে তাঁর মস্তকবিহীন দেহটি পুকুরপাড়ে সমাহিত হয়। এটাই কালুশাহর মাজার।

কালুশাহের ভাগ্নে জমজম খাঁর দুই স্ত্রীর স্মৃতিতে উপজেলার লংগাইর ইউনিয়নের ফুকসাইরের পাশাপাশি দু’টি পুকুর ‘দুই সতিনের দীঘি’ নামে পরিচিত। ১৭৬৬ সালের ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনে গফরগাঁয়ের দুবাষিয়া গ্রামের দরবেশদের অবদান অবিস্মরণীয়।

গফরগাঁওয়ের উস্থি ইউনিয়নের তেরশ্রী গ্রামে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে, ৬শ বছরের প্রাচীন তেরশ্রী জামে মসজিদ। এছাড়াও আছে: গফরগাঁও স্টেশন মসজিদ, দিঘিরপাড় গিয়াসউদ্দিন আযমশাহের মসজিদ, গয়েশপুর বাজার মসজিদ, সুতারচাপ মসজিদ, পাঁচবাগ মসজিদ, আঠারোদানা শেখবাড়ি মসজিদ, মলমল সরকারবাড়ি মসজিদ, সতরবাড়ি মিঞাবাড়ি মসজিদ।

মৌলবি রেয়াজ উদ্দিন ১৯২১ সালে পাঁচবাগ ইসলামিয়া আলিয়া মাদ্রাসা এবং মাদ্রাসা সংলগ্ন মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। গফরগাঁওয়ে জেএম কামিল মাদ্রাসা, শামসুল হক মহিলা ফাজিল মাদ্রাসা, গয়েশপুর ফাজিল মাদ্রাসা, বিরই ফাজিল মাদ্রাসা, বরইহাটি ফাজিল মাদ্রাসা, টাঙ্গাব ফাজিল মাদ্রাসা ছাড়াও আছে অনেকগুলো দাখিল আলিম মাদ্রাসা। 

গফরগাঁওয়ের ঐতিহ্য- কওমি, হাফিজি মাদ্রাসা। যেমন: জামিয়া নুরুল উলুম কওমি মাদ্রাসা, খুরশিদ মহল কওমি মাদ্রাসা, মাদ্রাসাতুল আবরার কওমি মাদ্রাসা, আল ইতকান ইত্যাদি।

গফরগাঁও উপজেলার রাওনা ইউনিয়নের ‘জব্বার নগর’ (পাচুয়া) গ্রামে ভাষা শহিদ আ. জব্বার (১৯১৯-১৯৫২)-এর বাড়ির সংলগ্ন শহিদ জব্বার প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং শহিদ মিনারের পাশে ২০০৭ সালে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর নির্মিত হয়।Swap Meets & Outdoor Markets

গফরগাওঁয়ের মুসলিম ঐতিহ্যের পুরোধা, ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের অন্যতম যোদ্ধা মাওলানা শামছুল হুদা পাঁচবাগি (রহ.)। তিনি ১৯৩৭ হতে ১৯৫৪ সন পর্যন্ত আইন সভার সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৭১-এর লড়াকু সমর্থক এবং বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ। 

মাসিক মদীনা সম্পাদক, বহু গ্রন্থ প্রণেতা মাওলানা মুহিউদ্দিন খান (১৯ এপ্রিল ১৯৩৫- ২৫ জুন ২০১৬) গফরগাওঁয়ের স্বর্ণসন্তান। এছাড়াও বিখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হলেন: মাওলানা আব্দুল্লাহিল বাক্বি নোমান, মাওলানা মুফতি মিজানুর রহমান ফরিদি, মাওলানা মোফাখখারুল ইসলাম রানা, ক্বারি হাবিবুল্লাহ বেলালি প্রমুখ।

গফরগাঁওয়ের প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী এবং পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রী ছিলেন মরহুম গিয়াস উদ্দিন খান পাঠান। আরও স্মরণ করছি সর্বমরহুম-

মুন্সি হুরমত উল্লাহ: ব্রিটিশ বিরোধী নেতা। খোদাদাদ খান: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। ডা এম, এ হাদি: বাংলাদেশের প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। মোহাম্মদ আবুল হাশেম: পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ ও বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য। অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য। মরহুম আসকর আলী সরকার: শিক্ষানুরাগী ও বিশিষ্ট সমাজকর্মী। মো. আলী নওয়াজ উকিল: আয়কর আইনজীবী ও সমাজসেবক। একেএম মঞ্জুরুল হক: রাজনৈতিক নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের এ্যাডভোকেট প্রমুখকে।

শেষকথা, ১৯৭১-এ পাক-যুদ্ধবিমান গফরগাঁওয়ে গুলিবর্ষণ করলে ১৭ জন শহিদ এবং শতাধিক আহত হন।Politics

পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ গফরগাঁওয়ের সত্য ঘটনা অবলম্বনে রচিত। জীবন নকশার ভাঁজে ভাঁজে সূঁচের খোঁচায় যন্ত্রণাকাতর আর্তি গফরগাঁওয়ের মেঠোসুরে আজো অনুরণিত হয় বেঁচে থাকার সংগ্রামী দীর্ঘশ্বাসে:

“আজো এই গাঁও অঝোরে চাহিয়া ওই গাঁওটির পানে

নীরবে বসিয়া কোন্ কথা যেন কহিতেছে কানে কানে...

...কেহ তে নাকি গভীর রাত্রে দেখেছে মাঠের পরে

মহা-শূন্যেতে উড়াইছে কেবা নকসী কাঁথাটি ধরে

হাতে তার সেই বাঁশের বরুণ  ঢেউ লাগি এ-গাঁও ওগাঁও গহন ব্যথায় ঝুরে”।