বিজাতীয় অনুকরণ সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান
ইসলামের অনুসারীদের জন্য শুধু ইবাদত-বন্দেগি নয়; বরং আচার-আচরণ, সংস্কৃতি ও জীবনধারার ক্ষেত্রেও নিজস্ব পরিচয় বজায় রাখা অপরিহার্য। অন্য জাতির অন্ধ অনুকরণ ইসলামে কঠোরভাবে নিরুত্সাহী করা হয়েছে, কারণ এতে মুসলিম সত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো, প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের আদর্শ অনুসরণ করা।
১. বিজাতীয় অনুকরণ সম্পর্কে ইসলামের মৌলিক অবস্থান : ইসলামে বিজাতীয় অনুকরণ পরিহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। হাদিসে এ বিষয়ে মুসলমানদের জন্য একটি মৌলিক দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তা হলো—নিজস্ব ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় অক্ষুণ্ণ রাখা। অতএব, মুসলমানদের জন্য অন্য জাতির অন্ধ অনুকরণ পরিত্যাজ্য। ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে সে তাদের দলভুক্ত বিবেচিত হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪০৩১)
২. নামাজের সময় নির্ধারণে সাদৃশ্যতা পরিহার : ইসলামে তিনটি নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত এবং সূর্য মধ্যাকাশে অবস্থানকালে। এই সময়গুলোতে বহু অমুসলিম জাতি সূর্য উপাসনা করে থাকে। তাদের উপাসনা পেতে শয়তান সূর্যের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে মুসলমানদের ইবাদত যাতে তাদের উপাসনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয়, সেজন্য এই সময়গুলোতে নামাজ পড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে ইসলামের স্বাতন্ত্র্য সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। উকবাহ ইবন আমির আল জুহানি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তিনটি সময়ে আমাদেরকে নামাজ আদায় করতে এবং আমাদের মৃতদের দাফন করতে নিষেধ করেছেন। (১) সূর্য যখন আলোকোদ্ভাসিত হয়ে উদয় হতে থাকে তখন থেকে তা পরিষ্কারভাবে উপরে উঠা পর্যন্ত, (২) সূর্য যখন ঠিক দ্বিপ্রহরের সময় থেকে হেলে যাওয়া পর্যন্ত এবং (৩) সূর্য ক্ষীণ আলোক হওয়া থেকে তা সম্পূর্ণ অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। (মুসলিম, হাদিস : ৮৩১)
৩. সুতরা ব্যবহারের মাধ্যমে তাওহিদি চেতনা সংরক্ষণ : নামাজ আদায়কারীর সামনে দিয়ে অতিক্রম করা অনেক বড় পাপের কাজ। সেজন্য ফাঁকা স্থানে নামাজের সময় ‘সুতরা’ ব্যবহার করার বিধান রয়েছে। এটিও ইসলামের স্বাতন্ত্র্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ‘সুতরা’ এমনভাবে স্থাপন করতে বলা হয়েছে, যাতে তা সরাসরি কপাল বরাবর না হয়; বরং ডান বা বাম পাশে থাকে। এর উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো বস্তু বা প্রতীকের প্রতি সিজদার সাদৃশ্যতা সৃষ্টি না হওয়া। এর মাধ্যমে ইসলামের তাওহিদি আদর্শকে সুরক্ষিত রাখা হয়। সাহল ইবন আবু হাসমাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ সুতরা স্থাপন করে নামাজ আদায় করলে যেন সু্তরার কাছাকাছি দাঁড়ায়। যাতে করে শয়তান তার নামাজ ভঙ্গ করতে না পারে।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৬৯৫)
সুতরাকে ডান বা বাম পাশে রাখার বিষয়ে ফিকহি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে।
৪. মহররমের রোজা ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার নির্দেশনা : মহররম মাসের রোজার ক্ষেত্রেও ইসলাম স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছে। শুধু আশুরার দিনে একটি রোজা না রেখে তার সাথে পূর্ববর্তী বা পরবর্তী দিন মিলিয়ে দুটি রোজা রাখতে উত্সাহিত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো—অন্য ধর্মাবলম্বীদের অনুসরণ থেকে বিরত থাকা এবং ইসলামের স্বকীয়তা বজায় রাখা। আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তোমরা আশুরার রোজা আদায় করো আর ইহুদিদের বিরোধিতা করো। সেজন্য আশুরার আগে বা পরে একদিনসহ দুই দিন রোজা রাখো।’ (সুনানুল বাইহাকি আল-কুবরা, হাদিস : ৮১৮৯)
৫. সমকালীন প্রেক্ষাপটে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব : বর্তমান যুগে মুসলমানদের জীবনে বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। পোশাক-পরিচ্ছদ, উৎসব, আচার-অনুষ্ঠান, এমনকি জীবনধারার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অমুসলিম সংস্কৃতির অনুসরণ লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় অজান্তেই মুসলমানরা এসব অনুকরণ করে থাকে, যা ধীরে ধীরে তাদের ধর্মীয় পরিচয়কে দুর্বল করে দেয়।
৬. সুন্নাহ অনুসরণের গুরুত্ব : ইসলামে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ অপরিহার্য। তাঁর জীবনাদর্শই মুসলমানদের জন্য সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। বিজাতীয় সংস্কৃতি পরিহার করে সুন্নাহভিত্তিক জীবন গঠনই পারে একজন মুসলমানকে প্রকৃত স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা দান করতে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহর মধ্যে আছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ২১)
পরিশেষে বলা যায়, ইসলাম তার অনুসারীদের জন্য একটি স্বতন্ত্র ও পরিপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছে। তাই প্রতিটি মুসলমানের উচিত জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শ অনুসরণ করা এবং অন্য জাতির অনুকরণ থেকে বিরত থাকা।