বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
ইসলাম

বিদ্যুৎ অপচয় নিয়ামতের অবমূল্যায়নের শামিল

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন 19 এপ্রিল 2026, 06:51 বিকাল 73 বার পঠিত
বিদ্যুৎ অপচয় নিয়ামতের অবমূল্যায়নের শামিল

আমাদের দৈনন্দিন প্রায় সব কাজই বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করে। লাইট, ফ্যান, এসি, মোবাইল চার্জ, ইন্টারনেট-সবই বিদ্যুৎ ছাড়া বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেই জীবন থেমে যাওয়ার মতো মনে হয়।

শহরের বড় বড় ভবনে পানি ওঠে বিদ্যুতের পাম্প দিয়ে। লিফট চলে বিদ্যুৎ দিয়ে। হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, অফিসের কাজ, ট্রাফিক সিগন্যাল, এমনকি বড় মসজিদের ইবাদত পর্যন্ত বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। শহরে বিদ্যুৎ না থাকলে অজু-গোসল করার পানি ব্যবস্থা করাও কঠিন হয়ে যাবে। হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত হবে, অফিসের কাজ বন্ধ হয়ে যাবে, রাস্তায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।

এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পকারখানাও বিদ্যুৎ ছাড়া চলতে পারে না। পড়াশোনা, অনলাইন ক্লাস, ব্যাংকিং-এসব ক্ষেত্রেও বিদ্যুৎ খুবই জরুরি। তাই প্রতিটি মানুষের উচিত, মহান আল্লাহর এই মহামূল্যবান নিয়ামতের কদর করা।

নিয়ামতের মূল্যায়ন না করলে কখনো কখনো নিয়ামত সংকুচিত করে দেওয়া হয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তুমি একেবারে ব্যয়কুণ্ঠ হয়ো না আর একেবারে মুক্তহস্তও হয়ো না, তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে বসে থাকবে।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৯)

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, মহান আল্লাহর নিয়ামতগুলো তাঁর নির্দেশিত পদ্ধতি মেনে ভোগ করতে হয়, যদি তা না করা হয়, তাহলে মানুষকে বিপদ, অভাব-অনটনের সম্মুখীন হতে হয়।

বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরিন বিভিন্ন সংকটের কারণে বর্তমানে আমাদের দেশেও বিদ্যুৎ সংকট চলছে। গণমাধ্যম ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই বর্তমানে আমাদের দায়িত্ব হলো, বিদ্যুৎ অপচয় থেকে বিরত থাকা। বিদ্যুৎ ব্যবহারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। পবিত্র কোরআনে প্রিয় বান্দাদের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আর তারা যখন ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না। বরং মাঝামাঝি অবস্থানে থাকে।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৬৭)

হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের তিন বস্তু পছন্দ করেন আর তিন বস্তু অপছন্দ করেন। আল্লাহর পছন্দনীয় বস্তুগুলো হলো, তাঁর ইবাদত করা, তাঁর সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করা এবং সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ থাকা, বিচ্ছিন্ন না হওয়া। আর আল্লাহর অপছন্দনীয় বস্তু তিনটি হলো, অহেতুক কথা বলা, অহেতুক প্রশ্ন করা ও অনর্থক সম্পদ বিনষ্ট করা।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৭১৫)

প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুত ব্যবহার করাও অনর্থক সম্পদ বিনষ্টের শামিল। প্রয়োজন ছাড়া গরমকালেও অতি মাত্রায় এসি ব্যবহার করে কক্ষ শীতল করে শীতে কাতর হয়ে কোট গায়ে বসে থাকা কিংবা রাতে ঘুমানোর সময় এসি বাড়িয়ে কম্বল ব্যবহার করাও অপচয় ছাড়া কিছু নয়। এমনকি মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও একান্ত প্রয়োজন ছাড়া অতিরিক্ত মাত্রা এসি, ফ্যান, লাইট ইত্যাদি ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা উচিত। বিনা প্রয়োজনে ঘরের সব বাতি জ্বালিয়ে রাখা, যে কক্ষে কেউ নেই, সেখানেও পাখা চালিয়ে রাখা ইত্যাদি বিদ্যুৎ অপচয়। হাদিস শরীফে এধরনের আচরণ পরিহারের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘পানাহার করো, সদকা করো আর পোশাক পরিধান করো, যতক্ষণ তা অপচয় ও অহংকার মিশ্রিত না হয়।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩৬০৫)

অথচ অনেক মানুষ ব্যক্তি জীবনে যেমন ব্যাপক ভাবে অপচয় করে, তেমনি মসজিদ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গিয়েও অহেতুক লাইট, ফ্যান, এসি চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চাপ সৃষ্টি করে। যেটা কোনো মুমিনের জন্য শোভা পায় না। পবিত্র কোরআনে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই আখ্যায়িত করা হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৭)

আল্লামা বরকুভি (রহ.) বলেন, ‘শয়তানের ভাই শয়তানের মতোই। এই পৃথিবীতে শয়তানের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো নাম নেই। এ হিসেবে অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই আখ্যায়িত করার চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো বিশেষণ নেই।’ (আত-ত্বরিকতুল মুহাম্মদিয়্যা, পৃষ্ঠা : ১০৩)

কোনো কোনো হাদিসেতো প্রবাহমান নদীর তীরে বসেও অজুতে অতিরিক্ত পানি ব্যবহারে সতর্ক করা হয়েছে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২৫, মুসনাদে আহমাদ)

এগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহান আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ প্রয়োজন মাফিক ব্যবহার করতে হবে, তবে কোনো অবস্থাতেই যেন অপচয়ের পর্যায়ে না যায়, তা খেয়াল রাখতে হবে।