আত্মমুগ্ধতা নিয়ামত ছিনিয়ে নেয়
মানুষের গোটা জীবন আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহের সূতোয় গাঁথা। বান্দার প্রতিটি নিঃশ্বাসে, দৃষ্টিতে, রুটি-রুজিতে, সন্তান-সন্ততিতে থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রাপ্তিতেও বিরাজমান আল্লাহর অগণিত নিয়ামত। বান্দার উচিত, মহান আল্লাহর প্রতিটি নিয়ামতের শোকর আদায় করা। অপচয় না করা। আল্লাহর দেওয়া সামর্থ অনুপাতে নিজের ও নিজের আত্মীয় ও গরিব-মিসকিনদের সহযোগিতা করা।
মহান আল্লাহর নিয়ামতের শোকর আদায় করতঃ একটু ভালো ভাবে চলাফেরাতে দোষের কিছু নেই। বরং হাদিস শরীফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তাঁর দেওয়া নিয়ামতের নিদর্শন তাঁর বান্দার উপর দেখতে ভালোবাসেন (অর্থাত্ যাকে যে রকম নিয়ামত প্রদান করা হয়েছে সে অনুযায়ী পোশাক-পরিচ্ছেদ ব্যবহার করা আল্লাহ পছন্দ করেন)। (তিরমিজি, হাদিস : ২৮১৯)
তবে কোনো অবস্থাতেই নিজের ভালো অবস্থা ও অর্থ-সম্পদ নিয়ে আত্মমুগ্ধতায় ভোগা বা অহংকার করার সুযোগ নেই। মানুষ মনে করে সে তার নিজ যোগ্যতার বলে বাড়ি-গাড়ি, অর্থ-সম্পদের মালিক হয়। আসলে বাস্তবতা তা নয়, এসব তার যোগ্যতার ফল নয়, বরং প্রভুর অনুগ্রহের ছায়া। কিন্তু মানুষ না বুঝে সব প্রাপ্তীতে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করে। যেখানে তার কোনো কৃত্রিত্ব ছিল না, সেখানেও নিজেকে জাহির করতে দ্বিধা করে না।
মানুষ নিয়ামত পেয়ে শোকর আদায় করলে আল্লাহ নিয়ামত বাড়িয়ে দেন, আর অহংকার করলে আল্লাহ তার ওপর থেকে রহমত তুলে নেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাহ্যিক ভাবে সব পেয়েও দুনিয়া আখিরাতে ব্যর্থ হয়, আবার অনেক সময় প্রাপ্ত রিজিকও তার থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
এ জন্যই পবিত্র কোরআনে মুমিন বান্দাদের দম্ভ করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ইতিহাসের অন্যতম ধনী কারুনের পরিণতি স্মরণ করিয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয় কারূন ছিল মুসার সম্প্রদায়ভুক্ত কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছিল। আর আমরা তাকে দান করেছিলাম এমন ধনভাণ্ডার যার চাবিগুলো বহন করা একদল বলবান লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। স্মরণ করুন, যখন তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, অহংকার করো না, নিশ্চয় আল্লাহ অহংকারীদেরকে পছন্দ করেন না। (সুরা কাসাস, আয়াত : ৭৬)
তাই মুমিন কখনো আত্মমুগ্ধতায় ভুগতে পারে না। অহংকার করতে পারে না। একজন সত্যিকার মুমিনের পরিচয় ভিন্ন। মুমিন যেকোনো সফলতায় আল্লাহর দরবারে সিজদায় নত হয়, আল্লাহর শোকর করে, আর অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়।
এর বিপরীতে যদি কেউ আত্মমুগ্ধতায় ভোগে, তবে তা তার জন্য অকল্যাণ বয়ে আনে। হাদিস শরীফে এসেছে, মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বিষয় মারাত্মক ধ্বংসাত্মক : এক. অত্যধিক কৃপণতা, দুই. প্রবৃত্তির অনুসরণ, তিন. নিজেকে নিয়ে মুগ্ধতা।’ (শুআবুল ঈমান, বায়হাকি, হাদিস ৭৩১; আলমুজামুল আওসাত, তবারানি, হাদিস : ৫৪৫২)
তাই যেকোনো প্রাপ্তীতে আমাদের করণীয়, নিয়ামত পেলে হূদয়কে নত করা, সিজদায় লুটিয়ে পড়া, বলা: ‘হে আল্লাহ, সবই তোমার দান।’ কারণ কৃতজ্ঞতা নিয়ামতকে বাড়ায়, আর আত্মমুগ্ধতা তা কেড়ে নেয়।
আল্লাহর শোকর ও বিনয় বান্দার সুখ সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করে। দুনিয়া-আখিরাতের সফলতা এনে দেয়, আর আত্মমুগ্ধতা মানুষকে নিরবে শেষ করে দেয়। আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত করে।