যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার মঞ্চ প্রস্তুত
ছয় সপ্তাহের যুদ্ধের ইতি টানার লক্ষ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাদে শান্তি আলোচনায় বসতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
তবে লেবানন ও নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ছাড়া এ আলোচনা শুরু হবে না জানিয়ে তেহরান শনিবারের এ শান্তি আলোচনার পরিণতি নিয়ে শঙ্কা সৃষ্টি করেছে।
আলোচনার জন্য রওনা দেওয়া মার্কিন প্রতিনিধিদল বিমানে পুনরায় জ্বালানি ভরতে প্যারিসে যাত্রাবিরতি নিয়েছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এ দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পজামাতা জ্যারেড কুশনার।
পার্লামেন্টের স্পিকার বাকের কালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির নেতৃত্বাধীন ইরানি প্রতিনিধিদল শুক্রবারই পাকিস্তান পৌঁছে গেছে।
ইরানের হাতে ‘কোনো কার্ড নেই’, বলছেন ট্রাম্প
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে কালিবাফ জানান, ওয়াশিংটন আগে ইরানি সম্পদে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে ও লেবাননে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল। এই শর্তগুলো পূরণ হওয়া ছাড়া আলোচনা শুরু হবে না।
লেবাননে ইরানসমর্থিত হিজবুল্লাহ-র ওপর মার্চ থেকে ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, লেবানন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতির অংশ নয়। তবে ইরান এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান বলছে উল্টো কথা।
আলাদাভাবে কালিবাফ বলেছেন, ওয়াশিংটন যদি একটি সত্যিকারের চুক্তি প্রস্তাব করে এবং ইরানের অধিকারগুলো মেনে নেয় তাহলে তেহরান চুক্তিতে পৌঁছাতে প্রস্তুত। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এ উদ্ধৃতি এসেছে।
ইরানিদের শর্ত নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াইট হাউসের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে বলেছেন, কেবল চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতেই ইরানিদের বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে।
“ইরানিরা মনে হয় বুঝতে পারছে না যে আন্তর্জাতিক জলসীমা ব্যবহার করে বিশ্বের কাছ থেকে স্বল্পকালীন চাঁদাবাজি করা ছাড়া তাদের হাতে কোনো কার্ড নেই। আজ তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র কারণই হচ্ছে আলোচনা,” বলেছেন তিনি।
পাকিস্তানে রওনা হওয়ার সময় ভ্যান্স বলেন, আলোচনায় ইতিবাচক ফলই আশা করছেন তিনি।
“যদি তারা আমাদের সাথে প্রতারণার চেষ্টা করে, তাহলে দেখবে যে আলোচক দলটি ততটা উদার নয়,” বলেছেন মার্কিন এ ভাইস প্রেসিডেন্ট।
দুই পক্ষের এই আলোচনা উপলক্ষে শনিবার ইসলামাবাদ নজিরবিহীন লকডাউনে পড়েছে। সেনা ও আধাসামরিক বাহিনীর হাজার হাজার সদস্যকে রাজধানীর রাস্তায় দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এরই মধ্যে এ শান্তি আলোচনাকে ‘হয় হবে, নয়তো সর্বনাশ’ আখ্যা দিয়েছেন।
ট্রাম্প মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানো বন্ধ করে। কিন্তু এরপরও লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের যুদ্ধ থামেনি, তেহরানও হরমুজ প্রণালির অবরোধ তোলেনি। হরমুজে স্বাভাবিক নৌচলাচল না থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে যে বিঘ্ন ঘটেছে, বিশ্ব এর আগে কখনোই এমনটা দেখেনি।
লেবাননে যুদ্ধ চলছেই
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েখিয়ে লাইতার ও লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামাদেহ মোয়াওয়াদ মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে দুই পক্ষের হয়ে আলোচনায় বসবেন বলে জানিয়েছে ইসরায়েল ও লেবাননের কর্মকর্তারা।
তবে সেই আলোচনায় কী নিয়ে কথা হবে সে বিষয়ে পরষ্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে।
লেবাননের প্রেসিডেন্টের কার্যালয় বলেছে, দুই রাষ্ট্রদূতের মধ্যে শুক্রবার ফোনে কথা হয়েছে। তারা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরুর তারিখ নির্ধারণে সম্মত হয়েছেন।
অন্যদিকে ওয়াশিংটনের ইসরায়েল দূতাবাস বলছে, দুই পক্ষের আলোচনা ‘আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনার’ সূচনা হিসেবে গণ্য হবে এবং ইসরায়েল হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
শুক্রবারও ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে হামলা চালিয়ে গেছে। এর মধ্যে নাবাতিয়ে শহরে এক সরকারি ভবনে হামলায় লেবাননের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ১৩ সদস্য নিহত হয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সর্ববৃহৎ হামলা চালায়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় আচমকা এ হামলায় সাড়ে তিনশ’র বেশি বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে লেবাননের কর্তৃপক্ষ।
পাকিস্তানে হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার আলোচ্যসূচির মধ্যে তেহরান যেসব বিষয়ে নিয়ে কথা বলতে চায় তার মধ্যে বছরের পর বছর তার অর্থনীতিকে পঙ্গু করে রাখা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি হরমুজের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গও থাকবে। হরমুজ প্রণালি ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকলে এবং তারা সেখানে ট্রানজিট ফি তুলতে পারলে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটা বড় পরিবর্তন আসবে।
শুক্রবার সঙ্কীর্ণ ওই জলপথ দিয়ে ইরানের নৌযানগুলো বাধাহীনভাবে চলাচল করলেও অন্য দেশগুলোর নৌযানগুলো সেই সুযোগ পায়নি।