বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

শোলাকিয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে চার লাখ মানুষের নামাজ আদায়

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন 03 মে 2022, 04:51 দুপুর 465 বার পঠিত
শোলাকিয়ায় বৃষ্টিতে ভিজে চার লাখ মানুষের নামাজ আদায়

দুই বছর পর ঈদের জামাত ফিরেছে। মানুষের উৎসাহ ছিল অনেক বেশি। ভোগান্তিতে ফেলতে নেমেছিল বৃষ্টি। কিন্তু মানুষকে দমিয়ে রাখা যায়নি। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় আজ মঙ্গলবার বৃষ্টিতে ভিজে একসঙ্গে ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করলেন আনুমানিক ৪ লাখের বেশি মানুষ। 

এবার শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঈদুল ফিতরের ১৯৫তম জামাত। সকাল ১০টায় ছিল জামাত। এই মাঠের নিয়ম, নামাজ শুরুর আগে শর্টগানের ফাঁকা গুলির শব্দে সবাইকে নামাজের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য সঙ্কেত দেওয়া হয়। এবারো বন্দুকের ফাঁকা গুলি চালিয়ে জামাত শুরু হলো। লোকে লোকারণ্য এই ঈদ জামাতের ইমামতি করেন জেলা শহরের বড়বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা শোয়াইব বিন আবদুর রউফ।  

কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শামীম আলম শোলাকিয়া ঈদগাহ কমিটির সভাপতি। তিনি জানান, এই বছর অন্য বছরের চেয়ে বেশি মুসল্লি এসেছিলেন ঈদের জামাতে। মাঝে করোনার কারণে দুই বছর এখানে ঈদের নামাজ বন্ধ থাকায় মানুষের উৎসাহ ছিল বেশি। আবহাওয়া খারাপ হয়ে গেলেও তারা জায়গা ছাড়েননি। শামীম আলম জানিয়েছেন, এবার শোলাকিয়ায় চার লাখেরও বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করেছেন। 

সকাল থেকে আকাশ ছিল ভার। সব উপেক্ষা করে দূর দূরান্ত থেকে মুসল্লিরা শোলাকিয়ায় জমা হতে থাকেন। ৯টার পরই মাঠ ভরে যায়। এরপর সাড়ে ৯টার দিকে নামে বৃষ্টি। বৃষ্টি ছিল বেশ ভারী। যাদের ছাতা ছিল তারা তা ব্যবহার করেছেন। অনেককে দেখা গেছে পলিথিন মাথার ওপর ধরে বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে। যাদের কিছু করার ছিল না তারা খোলা আকাশের নিচে ভিজেছেন বৃষ্টিতে। শেষ অব্দি বৃষ্টিতে ভিজে নামাজ আদায় করে আল্লাহর প্রশংসা করতে করতেই তারা বাড়ি ফিরেছেন। 

বিরাট এই ঈদ আয়োজনকে নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত করতে স্থানীয় প্রশাসন ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছিল। র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ), বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং জেলা পুলিশের সহস্রাধিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। মাঠের ভেতর-বাইরে মিলে ৬৪টি সিসি ক্যামেরা ছিল। মাঠ পর্যবেক্ষণের চারটি ড্রোন। ছিল স্বেচ্ছাসেবক দল। মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা
করা হয়েছিল।

কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান। কালের স্রোতে শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানটি পরিণত হয়ে উঠেছে একটি ঐতিহাসিক স্থানে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত দিনাজপুরের "গোর-এ-শহীদ বড় ময়দানের" পর দ্বিতীয় সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয় এখানে। এটি কিশোরগঞ্জ শহরের পূর্বে নরসুন্দা নদীর তীরে এর অবস্থিত। 

ইসলামের ঐশী বাণী প্রচারের জন্য সুদূর ইয়েমেন থেকে আগত শোলাকিয়া 'সাহেব বাড়ির' পূর্বপুরুষ সুফি সৈয়দ আহমেদ তার নিজস্ব তালুকে ১৮২৮ সালে নরসুন্দা নদীর তীরে ঈদের জামাতের আয়োজন করেন। ওই জামাতে ইমামতি করেন সুফি সৈয়দ আহমেদ নিজেই। অনেকের মতে, মোনাজাতে তিনি মুসলি্লদের প্রাচুর্যতা প্রকাশে 'সোয়া লাখ' কথাটি ব্যবহার করেন। আরেক মতে, সেদিনের জামাতে ১ লাখ ২৫ হাজার (অর্থাৎ সোয়া লাখ) লোক জমায়েত হয়। ফলে এর নাম হয় 'সোয়া লাখি'।

পরবর্তীতে উচ্চারণের বিবর্তনে শোলাকিয়া নামটি চালু হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ বলেন, মোগল আমলে এখানে অবস্থিত পরগনার রাজস্বের পরিমাণ ছিল সোয়া লাখ টাকা। উচ্চারণের বিবর্তনে সোয়া লাখ থেকে সোয়ালাখিয়া, সেখান থেকে শোলাকিয়া। পরবর্তিতে ১৯৫০ সালে স্থানীয় দেওয়ান মান্নান দাদ খাঁ এই ময়দানকে অতিরিক্ত ৪.৩৫ একর জমি দান করেন।

বর্তমান শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের আয়তন ৭ একর। এখন এর পূর্বপ্রান্তে দু'তলা একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। এই ঈদগাহ মাঠটি চারপাশে উচু দেয়ালে ঘেরা হলেও মাঝে মাঝেই ফাঁকা রাখা হয়েছে যাতে মানুষ মাঠে প্রবেশ ও বের হতে পারে। এছাড়া এই মাঠের প্রাচীর দেয়ালে কোনো দরজা নেই। 

শোলাকিয়া মাঠে ২৬৫ সারির প্রতিটিতে ৫০০ করে মুসল্লি দাঁড়াবার ব্যবস্থা আছে। ফলে মাঠের ভেতর সবমিলিয়ে এক লাখ বত্রিশ হাজার ৫০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে ঈদুল ফিতরের সময় দেখা যায়, আশপাশের সড়ক, খোলা জায়গা, এমনকি বাড়ির উঠানেও নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। এভাবে সর্বমোট প্রায় তিন লাখ মুসল্লি ঈদের নামাজ পড়ে থাকেন। এবং এই মুসল্লির এই সংখ্যা প্রতিবছর বেড়ে চলেছে। শোলাকিয়া ঈদগাহ'র ব্যাবস্থাপনার জন্য ৫১ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটি রয়েছে। ঈদের নামাজের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতিমূলক কর্মকাণ্ড এই কমিটি করে থাকে।