শির ওয়াশিংটন সফরে জাঁকজমকের ভিড়ে অগ্রগতি ‘সামান্য’
ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের রাষ্ট্রীয় সফরে জাঁকজমকের কোনো কমতি দেখা যাচ্ছে না। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি যে খুব বেশি হচ্ছে না, সেই বাস্তবতা এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে বিবিসি।
বুধবার একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শির ওয়াশিংটন সফর শুরু হয়। বৃহস্পতিবার সকালে হোয়াইট হাউজে গার্ড অব অনারের মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।
বিবিসি লিখেছে, চীনা প্রেসিডেন্টের জন্য ট্রাম্পের এ আয়োজন ছিল আক্ষরিক ও রূপক—উভয় অর্থেই ‘লালগালিচা’ অভ্যর্থনা।
সামরিক ব্যান্ডের পরিবেশনা ও সামরিক বিমানের উড্ডয়নও ছিল এ আয়োজনের অংশ। তিন দিনের সফর শেষে শুক্রবার শির যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার কথা রয়েছে।
দুই নেতার প্রকাশ্য বক্তব্যেও ছিল উষ্ণতা ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারে পরিপূর্ণ। বৃহস্পতিবারের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগে শি চীন থেকে পান্ডা উপহার দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং নতুন একটি শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচির কথা জানান।
শি বলেন, “আমাদের দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের কারণকে এগিয়ে নিতে এবং একটি আরও ভালো বিশ্ব গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
অন্যদিকে ট্রাম্প বৈঠকে আলোচ্য বিষয় হিসেবে ‘নিরাপত্তা, প্রযুক্তি এবং সুপারইন্টেলিজেন্স-সংক্রান্ত জরুরি বিষয়’ থাকার কথা জানিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (এআই) বোঝাতে তিনি ‘সুপারইন্টেলিজেন্স’ শব্দটি ব্যবহার করেন।
ট্রাম্প বলেন, এসব বিষয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশক ধরে শান্তি ও সমৃদ্ধি এগিয়ে নিতে পারে।
জৌলুসের রাজনৈতিক বার্তা
বৃহস্পতিবারের সামরিক আয়োজনের পেছনে ট্রাম্পের বড় কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করেন ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক জেনিফার ওয়েলচ।
তার ভাষায়, “সম্মেলনের ইতিবাচক আবহ তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন করা হয়েছে।”
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ট্রাম্প নিজেকে ‘ভারসাম্য রক্ষাকারী’ হিসেবে দেখেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে শির বক্তব্যে কিছুটা কঠোর সুরও রয়েছে। হোয়াইট হাউজে দেওয়া বক্তব্যে তিনি আবারও ‘থুসিডিডিস ট্র্যাপ’ তত্ত্বের কথা বলেন। এ তত্ত্বের মোদ্দাকথা—বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন ঘটলে উদীয়মান ও অবনতিশীল শক্তির মধ্যে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ে।
শি বলেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিস্থিতি ভিন্ন হলেও ‘আন্তরিক, গভীর ও ধারাবাহিক সংলাপের’ মাধ্যমে দুই দেশ পরস্পরকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে, মতপার্থক্য পাশে রেখে অভিন্ন জায়গা খুঁজে নিতে পারে এবং পারস্পরিক আস্থা বাড়াতে পারে।
বাণিজ্যে সীমিত অগ্রগতি
দুই দেশের মধ্যে অর্থবহ কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর পথে এখনো বড় বড় বাধা রয়ে গেছে।
মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও শি বৈঠকে বসেছিলেন। তখন অর্থনৈতিক সম্পর্ক তদারকির জন্য বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বোর্ড গঠনে সম্মত হলেও এর বাইরে বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার বলেন, দুই দেশের মধ্যে এক বছর মেয়াদি যে বাণিজ্য ‘যুদ্ধবিরতি’ রয়েছে তা আরও দুই মাস বাড়ানো হবে।
আর্থিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চলমান সম্মেলন শেষ হওয়ার আগেই এর মেয়াদ আরও বাড়ানো হতে পারে, কারণ গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধ ফের শুরু হোক তা কোনো পক্ষই চায় না।
তবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ, ইউক্রেইন যুদ্ধ এবং এআই নিয়ন্ত্রণের মত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অগ্রগতির সম্ভাবনা ক্ষীণ।
বিবিসি লিখেছে, চীনের তরফে আরও মার্কিন কৃষিপণ্য কেনা এবং দেশটিতে আরও বিরল মৃত্তিকা খনিজ সরবরাহের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা পরিস্থিতিকে জটিল করছে। একই সময়ে তাইওয়ানের কাছে প্রস্তাবিত মার্কিন অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে ট্রাম্প কী সিদ্ধান্ত নেন, সেটিও দেখছে বেইজিং।
এআই নিয়ে ভিন্ন লক্ষ্য
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে দুই দেশের লক্ষ্য এক নয় বলে মন্তব্য করেছেন কিংস কলেজ লন্ডনের রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক রবিন ক্লিংলার-ভিডা।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্বেগ এআইয়ের অস্তিত্বগত ঝুঁকি এবং এ প্রযুক্তির অগ্রগতির গতি কিছুটা কমিয়ে আনা। কিন্তু চীনের লক্ষ্য এআইয়ের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া এবং বাস্তব অর্থনীতিতে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানো।
যুক্তরাষ্ট্রের এআই খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীর বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউজে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তুলে ধরার একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিবিসি লিখেছে, সব মিলিয়ে শক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি জৌলুস এবং স্থিতিশীলতার বার্তাই হয়ত শির এ সফরের অন্যতম প্রধান ফল হয়ে উঠতে পারে।
শুক্রবার বিকালে শি যুক্তরাষ্ট্র ছাড়ার আগে দুই নেতার আরও বৈঠক ও সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর প্রধান চীননীতি পরিকল্পনাকারী ও কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করা মাইলস ইউ বিবিসিকে বলেন, চীন সাধারণত ‘তত্ত্বীয় ও বিমূর্ত’ বিষয় নিয়ে কথা বলে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র চায় নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান।
তার ভাষায়, “দুই দেশের এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কোনো ফল পাওয়া কঠিন।”