বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

খুলনায় মেসে ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে ‘পিটিয়ে হত্যা’

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন 19 সেপ্টেম্বর 2026, 01:12 দুপুর 24 বার পঠিত
খুলনায় মেসে ‘ভাত চুরি’ করে খাওয়ার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রকে ‘পিটিয়ে হত্যা’

খুলনা নগরে ছাত্রাবাসে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।

শুক্রবার রাতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে খাজা খানজাহান আলী আবাসিক হলের পেছনে ইসলাম নগর রোডের একটি চারতলা ছাত্রাবাসে এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন খুলনা মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির।

নিহত ২১ বছর বয়সি আজমুল হোসেন চুয়াডাঙ্গার দর্শনার বড় শলুয়া গ্রামের কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি নগরীর বেসরকারি নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রথম সেমিস্টারের ছাত্র ছিলেন।

নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কানাই লাল সরকার বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর আজমুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তেমন কিছু জানে না।

তিনি বলেন, আজমুলের মা-বাবার সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাদের আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে বলেও জানান উপাচার্য।

নগরের হরিণটানা থানায় ওসি মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। আজমুলের বাবা মামলা না করলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করবে।

মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার হুমায়ুন কবির বলেন, “এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে আইনগতভাবে যা যা করা যায়, আমরা তাই করব।”

স্থানীয়দের ভাষ্য, চারতলা ভবন পুরোটা ছাত্রদের মেস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সেখানে ৫০ থেকে ৬০ জন ছাত্র থাকেন। প্রায় এক বছর আগে আজমুল চারতলার ডি-৮ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেন। চারতলায় মোট আটটি কক্ষ রয়েছে। ডি-২ কক্ষে থাকেন মেসের ম্যানেজার ও গোপালগঞ্জ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মেহেদী।

মেসের ছাত্রদের কাছে স্থানীয়রা শুনেছেন, শুক্রবার রাতে মেহেদীর ভাত খেয়ে ফেলেন আজমুল। এরপর ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেহেদীসহ মেসের কয়েকজন ও বহিরাগত কয়েকজন তাকে ছাদে নিয়ে মারধর করেন।

ছাদ থেকে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পান আশপাশের বাসিন্দারা। পরে তারা গলিতে আজমুলকে পড়ে থাকতে দেখেন। পরে মেসের অন্য ছাত্ররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

মৃত্যুর খবর পেয়ে মেসের ছাত্ররা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে দ্রুত চলে যান বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, আজমুলের সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার দুই পাও ভাঙা ছিল।

মেসের বুয়া ফাতেমা বললেন, আজমুলের বিরুদ্ধে এর আগেও টাকা ও ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ ছিল। তবে শুক্রবার রাতে ভাত চুরি করে খাওয়ার অভিযোগে মেসের ছাত্র ও বহিরাগতরা তাকে মারধর করেন। তিনি নিষেধ করলেও তারা শোনেননি।

মেসের পেছনের ভবনের এক নারী বাসিন্দা বলেন, শুক্রবার রাত পৌনে ১টার দিকে তিনি জোরে একটি শব্দ শুনতে পান। দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দেখেন, বাড়ির সামনে গলিতে একটি ছেলে পড়ে আছে। পরে মেসের ছাত্ররা তাকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

আজমুলের বাবা কুতুব উদ্দিন বলেন, “আমার দুই ছেলে। বড় ছেলে আজমুল। এক বছর আগে লেখাপড়ার জন্য বাড়ি থেকে খুলনায় আসে। আজমুল ২০২৫ সালে ও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারেনি। মাত্র ১০ দিন আগে নর্থ ওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাড়ি যায়।”

তিনি বলেন, শুক্রবার দুপুরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে খুলনায় আসে। রাত ৯টার দিকে ফোনে তাদের সঙ্গে আজমুলের শেষ কথা হয়।

“তখন সে বলেছিল, আমি ভালো আছি। তোমরা আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না”, বলেন কুতুব উদ্দিন।

তিনি বলেন, “রাত ১২টার পরে আমার ছেলের মোবাইল ফোন দিয়ে অন্য একটি ছেলে ফোন দেয়। বলে, আপনার ছেলে ঝামেলা করেছে। তাকে পেতে হলে দ্রুত এক লাখ টাকা নিয়ে আসেন। টাকা না আনলে আপনার ছেলেকে পাবেন না।

“তখন আমি বলি, আমরা গরিব মানুষ, এক লাখ টাকা কোথায় পাব? তখন সে বলে, আপনি কী করেন? আমি তাকে বলি, আমি কৃষিকাজ করি। তখন সেই ছেলে আবার বলে, আপনি দ্রুত চলে আসেন। তখন আমি বলি, আমি ট্রেনে দ্রুত আসছি।

“সে বলে, আপনি ট্রেনে আসবেন, না বাসে আসবেন, না প্লেনে আসবেন, সেটা আপনার ব্যাপার। তারপর সকালে এসে দেখি, আমার ছেলে আর বেঁচে নেই।”

কান্না জড়িত কণ্ঠে কুতুব উদ্দিন বলেন, “আমি কার কাছে এ বিচার দিব? আমি কারো কাছে বিচার দিব না। আমরা গরিব মানুষ। বাড়ি অনেক দূরে। আল্লাহর কাছে বিচার দিলাম।”

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক অধ্যাপক মো. সালাউদ্দিন বলেন, “ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানার বাইরে ঘটেছে, তাই সেখানে সরাসরি আমাদের কোনো এখতিয়ার নেই। তবে ঘটনাটি জানার পর থেকে পুলিশকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছি।”