জাতিসংঘে ভাষণ দিতে দাঁড়িয়ে নজিরবিহীন বয়কটের মুখেও নেতানিয়াহুর হুঙ্কার
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নজিরবিহীন বয়কট ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে গাজা ও ইরানে ইসরায়েলি হামলার সাফাই গাইলেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
বক্তব্য দেওয়ার সময় বেশ কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিরা কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে গেলেও সেসব তোয়াক্কা না করে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
বিবিসি জানিয়েছে, নেতানিয়াহু জাতিসংঘের মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ জানিয়ে সারিবদ্ধভাবে কক্ষ ত্যাগ করেন কয়েক ডজন দেশের কূটনীতিকরা।
এই ঘটনার মুখেও নিজেকে শক্ত রেখে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “আমরাই জিতব, আমাদের সামনে অন্য কোনো পথ নেই।”
প্রতিবাদকারী কূটনীতিকদের দিকে তির্যক বার্তা ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, “হলরুমে যদি এখনও কোনো নৈতিক কাপুরুষ থেকে থাকেন, তবে দয়া করে এখনই বেরিয়ে যান।”
একই সঙ্গে গাজায় গণহত্যা চালানোর আন্তর্জাতিক অভিযোগ অস্বীকার করেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী।
নেতানিয়াহুর এই ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগেই জাতিসংঘের বার্ষিক সম্মেলনে ভিডিও বার্তা দেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস।
তিনি বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে অবৈধ ইহুদি বসতি গড়ে ফিলিস্তিনিদের চিরতরে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদের চক্রান্ত করছে ইসরায়েল।
এই আগ্রাসী নীতি ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তির আন্তর্জাতিক ভিত্তি ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ প্রক্রিয়াকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেন আব্বাস।
তিনি বলেন, “গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনিদের ওপর হত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ, অনাহারে রাখা ও বিতাড়নের চেষ্টার পাশাপাশি এক গণহত্যামূলক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।”
যুক্তরাষ্ট্র ভিসা না দেওয়ায় জাতিসংঘের বার্ষিক এই সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি ফিলিস্তিনি নেতা। তাই ভিডিও বার্তার মাধ্যমেই তাকে অধিবেশনে যুক্ত হতে হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু ঠিকই নিউ ইয়র্কে হাজির হয়ে জাতিসংঘে বক্তৃতা করতে পেরেছেন। সেখানে তিনি সমালোচকদের প্রতি তীব্র বিষোদ্গার করেন।
বিশ্বনেতাদের দিকে আঙুল তুলে তিনি বলেন, “তারা ক্ষুদ্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উপনিবেশবাদের অভিযোগ তুলছে, কী আজব কথা! আর এই আঙুল তুলছে কারা? ব্রিটেন আর ফ্রান্সের মত দেশ, যে শব্দের জন্মই হয়েছে ওদের হাতে!”
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ানকেও ছাড়েননি নেতানিয়াহু, ফিলিস্তিনের সশস্ত্র দল হামাসকে সমর্থনের অভিযোগ তুলে তাকে ‘স্বৈরাচার’ আখ্যা দেন তিনি।
তবে তুর্কি প্রশাসন এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও জাতিসংঘের ‘শান্তির মূল্যবোধের পরিপন্থি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
এর আগে গত মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে এরদোয়ান বলেছিলেন, গাজা ও পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের প্রতি ঘটে চলা অন্যায়-অবিচার ‘মানবতার বিবেককে চরমভাবে আঘাত করে’।
একই সঙ্গে নিউ ইয়র্কের বামপন্থি মেয়র জোহরান মামদানিরও সমালোচনা করেন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেপ্তারের ঘোষণা দিয়েও পরে আইনি ক্ষমতার বাধ্যবাধকতা স্বীকার করেছিলেন মেয়র মামদানি।
তার বিরুদ্ধে নেতানিয়াহুর অভিযোগ, তিনি মেয়র হওয়ার পর নিউ ইয়র্কে ইহুদিদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।
এর জবাবে মেয়রের কার্যালয় বলেছে, ফিলিস্তিনে নিজের চালানো গণহত্যা ঢাকাতেই এমন মিথ্যাচার করছেন নেতানিয়াহু।
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বকে ‘সাহসী’ আখ্যা দিয়ে তার বিস্তর প্রশংসা করেন।
গত ফেব্রুয়ারিতে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ বিমান হামলার কথা তুলে করে তিনি বলেন, কেবল নিজেদের রক্ষা নয়, বরং ‘বিশ্ব সভ্যতাকে বাঁচাতেই’ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে দুই দেশ।
শৈশব ও কৈশোরে যুক্তরাষ্ট্রে কাটানো নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন রাজনীতিতে নিজের প্রভাব জাহির করে আসছেন।
তবে ওয়াশিংটন থেকে বিপুল সামরিক সহায়তা পেলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের জনমত এখন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। ডেমোক্রেটদের পাশাপাশি ট্রাম্পের সমর্থক রিপাবলিকানদের মধ্যেও ইসরায়েল নীতি নিয়ে এখন তীব্র দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই ঝাঁজালো বক্তব্য ছিল মূলত আগামী মাসের ইসরায়েলি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সাজানো এক রাজনৈতিক কৌশল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর এটিই সেখানে প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
হামাসের সেই আকস্মিক হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত ও ২৫১ জন জিম্মি হওয়ার পর নেতানিয়াহুর ‘মি. সিকিউরিটি’ ভাবমূর্তি গুঁড়িয়ে যায়।
আগাম গোয়েন্দা তথ্য উপেক্ষা করার অভিযোগ অস্বীকার করলেও জনমত জরিপে বেশ পিছিয়ে আছেন তিনি।
ধারণা করা হচ্ছে, জাতিসংঘের মঞ্চে একা লড়াই করার এই নাটকীয় রূপ দেশের ডানপন্থি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ব্যবহার করবেন তিনি।
জাতিসংঘ ভবনের ভেতরে যখন নেতানিয়াহুর বক্তব্য চলছিল, বাইরে তখন নিউ ইয়র্কের রাজপথে তীব্র প্রতিবাদের ঝড়।
সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করায় অস্কারজয়ী অভিনেত্রী সুসান সারানডন, এমিজয়ী অভিনেত্রী হান্না আইনবাইন্ডার এবং বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে আটক করে পুলিশ।
৭ অক্টোবরের পর থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় গাজায় এ পর্যন্ত ৭৩ হাজার ৯২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক গণহত্যা বিশেষজ্ঞদের সংগঠন আইএজিএস আগেই ঘোষণা করেছে, গাজায় ইসরায়েলের এই আগ্রাসন সরাসরি আন্তর্জাতিক গণহত্যার কাতারে পড়ে।