ইরানে বিয়েবাড়িতে হামলা: মার্কিন অস্ত্রের ‘সরাসরি আঘাতেই’ প্রাণহানি
দক্ষিণ ইরানের একটি বিয়েবাড়িতে প্রাণঘাতী বিস্ফোরণটি কোনো লক্ষ্যচ্যুত ক্ষেপণাস্ত্রের ছিটকে আসা অংশ নয়, বরং মার্কিন অস্ত্রের সরাসরি আঘাতেই ঘটেছিল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংগৃহীত ভিজ্যুয়াল এবং চারজন আন্তর্জাতিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞের যৌথ বিশ্লেষণে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
গত মঙ্গলবার রাতে হরমুজগান প্রদেশের সিরিক কাউন্টির উপকূলীয় শহর কুহেস্তাকে একটি বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালে ওই হামলা হয়। তাতে এক শিশুসহ চারজন নিহত এবং অন্তত ৬৮ জন আহত হন।
পারস্য উপসাগরে মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সাম্প্রতিক ইরানি হামলার জবাবে ওই রাতে দক্ষিণ ইরানে ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রাডার ও যোগাযোগ কেন্দ্র নিশানা করে একাধিক বিমান হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)।
রয়টার্স লিখেছে, ঘটনার সচিত্র প্রমাণ ও ভিডিও যাচাই করেছেন চারজন সামরিক অস্ত্র বিশেষজ্ঞ। সাবেক মার্কিন সেনা টেকনিশিয়ান ট্রেভর বল বলেছেন, ভবনের ছাদে যে ধরনের ক্ষত দেখা গেছে, তা ছাদের ঠিক ওপরে বা ছাদে এসে কোনো অস্ত্রের সরাসরি বিস্ফোরণেরই ফল।
পাশের টাওয়ারে হামলার আঘাত বা ছিটকে আসা টুকরো থেকে এমন ধ্বংসযজ্ঞ হতে পারে না।
অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ ব্রিগেডিয়ার ও বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ গ্যারেথ কলেট জানান, আলামত দেখে এটি মার্কিন বাহিনীর ৫০০ পাউন্ডের এয়ার-ড্রপড বোমা বলেই মনে হচ্ছে।
ওসলোর পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সেবাস্টিয়ান শুটে একই মত প্রকাশ করে বলেছেন, ছাদের ক্ষতের ধরন প্রমাণ করে, এটি কোনো মিসাইলের ছিটকে আসা অংশ নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধ্বংসস্তূপ দেখে এটিকে ব্যর্থ ইরানি বিমান প্রতিরক্ষা মিসাইল মনে করার কোনো সুযোগ নেই।
ট্রেভর বল ইরানি মিডিয়ায় দেখানো বোমার ধ্বংসাবশেষের টুকরো দেখে সেটিকে মার্কিন বাহিনীর ব্যবহৃত ‘জেএসওডব্লিউ’ গ্লাইড বোমা হিসেবে শনাক্ত করেছেন।
গ্যারেথ কলেট বলেন, “অত্যন্ত উন্নত গাইডেড সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক বোমা ফেলার সময় মাঝে মাঝে এমন লক্ষ্যচ্যুতির ঘটনা ঘটে।”
হামলার পরপরই রয়টার্সকে পাঠানো এক আবেগঘন বার্তা দিতে গিয়ে স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, “কুহেস্তাক ধ্বংস হয়ে গেছে! ৪ থেকে ১০টি ঘরবাড়ি একেবারে শেষ হয়ে গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন অনেক মানুষ। হায় আল্লাহ, আমাদের রক্ষা করো।”
অধিকার সংস্থা ‘বেলুচেস্থান হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন নেটওয়ার্ক’ ও ‘হালভশ’-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিয়েবাড়ির ভেতরে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৩ বছর বয়সী কুলসুম মোল্লাহি, ৫০ বছর বয়সী জারখাতুন তাহেরি এবং ৪ বছর বয়সী শিশু আমীর মোহাম্মদ করিমি।
এছাড়া বিয়েবাড়ির কাছেই টেলিকম টাওয়ারের পাশে মোটরসাইকেল চালানোর সময় মারা যায় ১৬ বছর বয়সী কিশোর মোহাম্মদ মাল্লাহি।
বৃহস্পতিবার তাদের শেষকৃত্যে কুহেস্তাক শহরে শোকের ছায়া নেমে আসে। কফিনের পেছনে শত শত মানুষের মিছিলে অংশ নেওয়া স্বজনরা তখন কাঁদছিলেন।
ঐতিহ্যবাসী লাল নেকাব ও কালো বোরকা পরা নারীরা চার বছরের শিশু আমীরের ছোট্ট কফিনে ফুল ছিটিয়ে শেষ বিদায় জানান।
বৃহস্পতিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত করছে।
“আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি কারণ স্পষ্টতই আমরা এটি নিয়ে উদ্বিগ্ন। আমরা আসল ঘটনা জানতে চাই।”
দুজন মার্কিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, কুহেস্তাক শহরের যোগাযোগ টাওয়ার লক্ষ্য করে ১ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৯টার দিকে মার্কিন বাহিনী হামলা চালিয়েছিল।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ওই টেলিকম টাওয়ারটি ধ্বংসপ্রাপ্ত বিয়েবাড়ি থেকে মাত্র ১৩৫ মিটার দূরে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত টাওয়ারটি কোনো সামরিক কেন্দ্র ছিল না, বরং এটি সাধারণ নাগরিকদের মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার কাজে ব্যবহৃত হত।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার দিনে মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৭৫ জনের বেশি শিশু ও শিক্ষক নিহতের পর কুহেস্তাকের এই ঘটনাটি সবচেয়ে বড় বেসামরিক হতাহতের খবর হিসেবে সামনে এসেছে।
মিনাব হামলার প্রাথমিক অভ্যন্তরীণ তদন্তেও মার্কিন বাহিনী দায়ী বলে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল।
গত ছয় মাস ধরে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ঠেকাতে মার্কিন বাহিনী ধারাবাহিকভাবে ইরানের রাডার ও যোগাযোগ কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে আসছে।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বজায় রাখা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
কারণ তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি পাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী সংসদীয় নির্বাচনে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।