বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
সংস্কৃতি

ইলম, আমল ও খেদমতের উজ্জ্বল এক প্রতিচ্ছবি

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন 18 নভেম্বর 2025, 05:42 বিকাল 184 বার পঠিত
ইলম, আমল ও খেদমতের উজ্জ্বল এক প্রতিচ্ছবি

আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে ময়মনসিংহের গফরগাঁও অঞ্চল বহু যোগ্য ও খ্যাতিমান আলেমের বরকতে সমৃদ্ধ। এখানেই জন্মগ্রহণ করেছেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক হযরত মাওলানা শামসুল হুদা পাঁচবাগী রহ., মুজাহিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা বোরহান উদ্দিন রহ., হযরত মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ., হযরত মাওলানা আব্দুল আলীম হোসাইনী রহ., হযরত মাওলানা ফখরুল ইসলাম রহ. সহ আরও অসংখ্য প্রখ্যাত উলামায়ে কেরাম। তাঁরা তাঁদের সাধ্য অনুযায়ী দ্বীনের খিদমত করেছেন, ইলমের আলো ছড়িয়েছেন এবং সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

এই ধারাবাহিকতার আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন সদ্যপ্রয়াত বর্ষীয়ান আলেম হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান সালমানী রহ.। গত ১৪ নভেম্বর ২০২৫ ইং, রোজ শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

চার দশকেরও বেশি সময় তিনি দ্বীনের খিদমতে কাটিয়েছেন—মাদ্রাসায় শিক্ষকতা, মসজিদের দায়িত্ব, দাওয়াত ইলাল্লাহ্, ইসলাহী কার্যক্রম এবং সমাজসেবামূলক নানা কাজ তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন। নীরবে-নিভৃতে তিনি যে কাজগুলো করে গেছেন, সেগুলো সত্যিকার অর্থেই উম্মতের কল্যাণের জন্যই ছিল।

হযরতের ইন্তেকাল গফরগাঁওবাসীসহ পুরো অঞ্চলের জন্য একটি বড় ক্ষতি। তবে তাঁর রেখে যাওয়া আমল, নসিহত ও জীবনাদর্শ ইনশাআল্লাহ আমাদের জন্য চিরন্তন প্রেরণা হয়ে থাকবে।

আল্লাহ তাআলা হযরতের সকল খেদমত কবুল করুন, তাঁকে ক্ষমা করুন এবং উত্তম প্রতিদান দান করুন—আমিন।

এ লেখায় আমরা মাওলানা মাহমুদুল হাসান সালমানী রহ.-এর জীবনের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরছি।

জন্ম ও প্রারম্ভিক জীবন

মাওলানা মাহমুদুল হাসান সালমানী রহ. ১৯৫৭ সালে ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার দুগাছিয়া গ্রামে মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা বোরহান উদ্দিন রহ. -এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন (আল্লামা বোরহান উদ্দিন রহ. ছিলেন হযরত মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ্ হাফিজ্জী হুজুর রহিমাহুল্লাহর সমসাময়িক এবং দ্বীনি খিদমতে তাঁর একান্ত আস্থাভাজন ও বিশিষ্ট বুজুর্গ ব্যক্তিত্ব)।

শিক্ষাজীবন

পারিবারিক পরিবেশেই তাঁর দ্বীনি শিক্ষার হাতে খড়ি হয়। এরপর ইলম অর্জনের জন্য তিনি দেশের প্রখ্যাত মাদরাসাগুলোতে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রথমে ময়মনসিংহ বড় মসজিদ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। এরপর ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া কোরআনিয়া লালবাগ ও জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। সবশেষে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দে গমন করেন এবং সেখানে নিজের ইলমী পথচলার শেষ ধাপ সম্পন্ন করেন।

ছাত্রজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি উত্তম চরিত্র, পড়াশোনায় মনোযোগ এবং আমলে স্থিরতার জন্য উস্তাদদের নিকট অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। আর আখলাকে সৌন্দর্য, সহনশীলতা ও পরিশ্রমী স্বভাবের কারণে সহপাঠীদের মধ্যেও তাঁর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

পারিবারিক দ্বীনি পরিচয়

মাওলানা সালমানীর পরিবার ছিল দ্বীনি ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। তাঁর পিতা আল্লামা বোরহান উদ্দিন রহ. ছিলেন দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবির—হযরত শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর খাস ছাত্র ও খাদেম। এই সম্পর্ক ছোটবেলা থেকেই মাওলানা সালমানীর অন্তরে মাদানী মিজাজ, দেশপ্রেম, ইলমের খিদমত এবং উলামায়ে হকের প্রতি গভীর মহব্বত সৃষ্টি করে।

পরবর্তীতে তাঁর তাদরিসী জীবন, দাওয়াত, ব্যক্তিজীবন, সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড এবং বাতিল প্রতিরোধের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই মাদানী মিজাজের সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়।

সুন্নতের অনুসরণ

হযরত মাওলানা মাহমুদুল হাসান সালমানী রহ.-এর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সুন্নতের অনুসরণ। তিনি চলাফেরা, কথাবার্তা, খাবার-পানাহার এবং পোশাকসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুন্নতের অনুসরণ করতেন। দৈনন্দিন অভ্যাস থেকে শুরু করে বাহ্যিক আমল পর্যন্ত সব জায়গায় তার সুন্নতি জীবনযাপন স্পষ্টভাবে দেখা যেত। এটি ছিল তাঁর জীবনের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি।

একজন সফল মুহতামিম

মাওলানা মাহমুদুল হাসান সালমানী রহ. পিতার প্রতিষ্ঠিত গফরগাঁও দুগাছিয়া জামিয়া হোসাইনিয়া মাদ্রাসার মুহতামিম হিসেবে তিন দশকেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে তিনি মাদ্রাসার তা'লিম-তারবিয়তের মান উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। শিক্ষার্থীদের আখলাক ও আমল গঠনে গুরুত্ব দেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে দাওরা হাদিস পর্যায়ে উন্নীত করেন। আলহামদুলিল্লাহ, হযরতের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা ছাত্ররা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দ্বীনি খিদমতে নিয়োজিত।

আমানতদার মুহতামিম

হযরতের আমানতদারিতা ছিল সত্যিই উল্লেখযোগ্য। এত দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকার পরও তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ কখনো ওঠেনি। তাঁর সততা ও নিষ্ঠা নবীন মুহতামিমদের জন্য অনুসরণযোগ্য একটি দৃষ্টান্ত।

দেশের বিভিন্ন এলাকার মুহতামিম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা তাঁর কাছে এসে পরামর্শ নিতেন, মাদ্রাসা পরিচালনার নীতি শিখতেন।তাঁর পরিচালন-নীতি দেখে অনেকেই নিজেদের প্রতিষ্ঠানে তা প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছেন।