বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
জাতীয়

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আবারও উদ্বেগ, পর্যালোচনার দাবি

অনলাইন নিউজ পোর্টাল 07 মার্চ 2021, 10:17 দুপুর 255 বার পঠিত
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আবারও উদ্বেগ, পর্যালোচনার দাবি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আবারও উদ্বেগের কথা জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। আজ শনিবার এক বিবৃতিতে পরিষদ বলেছে, আইনটির আপত্তিকর ধারাগুলো সংশোধন করা হলে হয়তো আজকের পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। এ আইন পর্যালোচনা করার বিষয়ে সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া আইনমন্ত্রীর বক্তব্যকে প্রাথমিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে পরিষদ। একই সঙ্গে তাঁর বক্তব্য অনতিবিলম্বে আইনগতভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ এবং এ জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ বা আইনি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।


বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রয়োগে সংবাদকর্মী ও মুক্তমত প্রকাশকারী ব্যক্তিরা ক্রমাগতভাবে নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এমন আশঙ্কা আইনটি তৈরির সময়ই করেছিল পরিষদ। এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশঙ্কার চেয়েও আরও কঠিনভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। একজন মুক্তমনা লেখক মুশতাক আহমেদকে জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে যেতে হলো।


১০ মাস কারাবন্দী থাকার পর কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে জামিন দেওয়ায় আদালতকে ধন্যবাদ জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। তবে পরিষদ বলেছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সংবাদকর্মী ও লেখকদের গ্রেপ্তার করে তাঁদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে নির্দয় আচরণ করছে, তা অত্যন্ত অনভিপ্রেত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি লেখা শেয়ার দেওয়ার কারণে সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে দীর্ঘদিন নিখোঁজ ও কারাগারে থাকতে হয়েছে। পরে জামিন পেলেও তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলো চলমান রয়েছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়া কিশোর জামিন পেলেও তাঁর মামলাটি চলমান আছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি মিডিয়া ওয়াচডগ বডি আর্টিকেল ১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ১৯৮টি মামলায় ৪৫৭ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ৪৫৭ জনের মধ্যে ৭৫ জন সাংবাদিক। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনকে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে।
ঘটনাক্রমের পরিপ্রেক্ষিতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আইনটি পর্যালোচনা করা হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে তদন্তের আগেই যেন গ্রেপ্তার করা না হয়, এমন ব্যবস্থা করা হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।


এ বিষয়টি উল্লেখ করে সম্পাদক পরিষদ বিবৃতিতে বলেছে ‘প্রাথমিকভাবে আইনমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই। আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনতিবিলম্বে আইনগতভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই। এ জন্য অবিলম্বে প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ বা আইনি উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানাই।’
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আপত্তিকর ধারাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা সেগুলো সংশোধনের সুপারিশ করেছিলেন। সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া হলে আজকের এ পরিস্থিতির হয়তো উদ্ভব হতো না।


‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে আমরা কেন উদ্বিগ্ন’ তা ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বিশদভাবে ব্যাখ্যা করেছিল সম্পাদক পরিষদ। ব্যাখ্যায় আইনটির ৯টি ধারা (৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১, ৩২, ৪৩ ও ৫৩) নিয়ে সম্পাদক পরিষদ তাদের উদ্বেগ তুলে ধরেছিল। তখন পরিষদ বলেছিল, ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি ও বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করবে। এই আইনের ৮, ২১, ২৫, ২৮, ২৯, ৩১ ও ৩২ ধারা সংবিধানপ্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই ধারাগুলো নাগরিকদের বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণেরও সুযোগ সৃষ্টি করবে।


যেমন ৮ ধারায় উল্লেখ আছে, যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে প্রতীয়মান হয় যে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত কোনো তথ্য-উপাত্ত দেশের বা তার কোনো অংশের সংহতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ধর্মীয় মূল্যবোধ বা জনশৃঙ্খলা ক্ষুণ্ন করে বা জাতিগত বিদ্বেষ ও ঘৃণার সঞ্চার করে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই সব তথ্য-উপাত্ত অপসারণ বা ব্লক করার জন্য বিটিআরসিকে অনুরোধ করতে পারবে।


২১ ধারা বলছে, যদি কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতির পিতা, জাতীয় সংগীত বা জাতীয় পতাকার বিরুদ্ধে কোনো প্রকার প্রপাগান্ডা ও প্রচারণা চালান বা তাতে মদদ দেন, তাহলে ওই ব্যক্তির সেটা অপরাধ হবে।
এ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ ২০১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর এক ব্যাখ্যায় বলেছিল, ‘আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা ও সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের প্রতি পরিপূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ এবং অতীতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অপচেষ্টার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা উপলব্ধি করি যে এ বিষয়ে কিছু করা প্রয়োজন। তবে “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” খুবই অস্পষ্ট একটি শব্দবন্ধ। কী কী করলে তা এই ধারার অধীনে “অপরাধ” বলে গণ্য হবে, তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট না করায় এবং “অপরাধগুলো”কে আরও সংজ্ঞায়িত না করায় এই আইনের গুরুতর অপব্যবহার ও সাংবাদিকদের হয়রানির ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
২৫ ধারায় আছে, যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শন অথবা মিথ্যা বলে জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয়প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন বা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ন করার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে বা কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করতে সহায়তা করেন, তাহলে ওই ব্যক্তির এ কাজটি হবে অপরাধ।

 


২৮ ধারা বলছে, যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে ধর্মীয় মূল্যবোধ বা অনুভূতিতে আঘাত করার বা উসকানি দেওয়ার অভিপ্রায়ে ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় অনুভূতি বা ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তির এ কাজ হবে একটি অপরাধ।