ধানমন্ডি ৩২: ইতিহাসের ধ্বংসস্তূপে লুটপাটের হিড়িক
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি ভাঙার তৃতীয় দিনেও সেখানে জনতার ভিড় অব্যাহত। ভারী যন্ত্রপাতি না থাকলেও হাতুড়ি ও ব্লেড দিয়ে ইট ও রড সংগ্রহের হিড়িক পড়ে যায়। বিদ্যুতের তারও তোলা হচ্ছে মাটি খুঁড়ে।
ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির ছয় মাস পূর্তির দিনে ‘বুলডোজার মিছিল’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাড়িটি ভাঙা শুরু হয়, যা বৃহস্পতিবার দিনভর চলে। এরপর ভারী যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া হলেও শুক্রবারেও মানুষ হাতুড়ি পিটিয়ে রড, ইট ও বৈদ্যুতিক তার সংগ্রহ করছিল।
কেরানীগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর থেকে আসা ব্যক্তিরা জানান, তারা রড সংগ্রহ করে বিক্রি করছেন। একদল যুবক মাটি খুঁড়ে বৈদ্যুতিক তার সংগ্রহের কাজ করছিল। অনেকে বাড়িটি ঘুরে দেখছিলেন, ছবি তুলছিলেন। কেরানীগঞ্জ থেকে আসা তাজুল ইসলাম জানালেন, খবর পেয়ে শুক্রবারই এসেছেন রড নিতে।
তিনি বলেন, “সকাল থেইকা আইসা খোলা শুরু করছি। যতক্ষণ পারি খুলি, এরপরে ভাঙারির দোকানে নিয়া বেইচা দিমু।” মোহাম্মদপুর থেকে আসা দেলোয়ার বলেন, “সবাই নিতাছে, আমিও নিই। কালকেও কিছু নিয়া রাখছি। আজকে যা পারি একলগে কইরা বেচমু।” জালাল নামের একজন বলেন, “কারেন্টের তার আছে, ওইগুলা বাইর করমু। তারের মেলা দাম পাওন যায়।”
কয়েক বন্ধু নিয়ে উত্তরা থেকে দেখতে আসা শামীম আহমেদ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা স্বৈরাচারের পরিণতি কী হয় সেটা দেখতে আসছি। কয়েকমাসের ব্যবধানে কী জায়গাটা কী হয়ে গেল। মাটির সাথে মিশে গেল সব। আশা করছি ভবিষ্যতে সবাই এ থেকে শিক্ষা নেবে।”
তৌহিদ হোসেন নামের একজন বলেন, “এই যে লাখ লাখ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, হাজার হাজার কোটি টাকা বানাইছে একেকজন, তারা আজ কই? শেখ মুজিবরে মারল, কেউ আসলোনা, শেখ হাসিনা পালায়ে গেল, কেউ আসলোনা। আজকে শেখ মুজিবের বাড়ি গুঁড়িয়ে দিল, তাও কেউ আসে নাই। তাইলে এতো এতো দলবাজি, দুর্নীতি, ক্ষমতার বড়াই কিসের জন্য? কেউ বোঝে না জনগণের ক্ষমতার চাইতে বড় কিছু নাই।”
ছুটির দিন হওয়ায় শুক্রবার দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে এসেছেন ধানমন্ডির বাসিন্দা বেসরকারি চাকরিজীবী আব্দুস সামাদ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, “যখন জাদুঘর ছিল, তখন একবার ছেলেদের নিয়ে আসছিলাম। কাল থেকেই ছেলেরা বলতেছিল, বাড়িটা ভেঙে দিচ্ছে, দেখতে আসবে। এজন্য নিয়ে আসলাম। সবকিছু নতুন করে গড়া সম্ভব, কিন্তু কিছু ইতিহাস, কিছু স্মৃতি হাজার কোটি টাকা দিলেও আবার গড়া সম্ভব না।”
বৃহস্পতিবার বিকেলে সেখানে গরু জবাই করে বিরিয়ানি রান্না ও রাতে জেয়াফতের আয়োজন করা হয়। এ ঘটনার রেশ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, বঙ্গবন্ধু পরিবারের ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙচুর হয়। আওয়ামী লীগ নেতাদের বাড়িঘর ও দলীয় কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।