শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
অর্থনীতি

আকাশে বাড়ছে রাজস্ব

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 09 অক্টোবর 2026, 12:47 দুপুর • 4 বার পঠিত
আকাশে বাড়ছে রাজস্ব

বাংলাদেশের আকাশসীমা এখন শুধু উড়োজাহাজ চলাচলের পথ নয়, সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজস্বের উৎসও। বিদেশি উড়োজাহাজ বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করে যে ‘ওভারফ্লাই’ চার্জ দেয়, সেখান থেকে গত এক বছরে বাংলাদেশ পেয়েছে ৮০৫ কোটি টাকার বেশি।

আধুনিক এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) ও রাডার ব্যবস্থার পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগাতে পারলে এই আয় কয়েক গুণ বাড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিদ্যমান যেসব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও অবকাঠামো রয়েছে এর সঙ্গে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক অনুমোদন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সমন্বয়, দক্ষ জনবল আর প্রশিক্ষণ।

 জানা যায় প্রায় ৯৪২ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক রাডার ও এটিসি অবকাঠামো তৈরি হলেও এর পূর্ণ সক্ষমতা এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। 

বেবিচকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ওভারফ্লাই থেকে আয় হয়েছে ৪১৬ কোটি ৯১ লাখ ৪৪ হাজার ৯১৪ টাকা।

এর আগের ছয় মাসে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আয় হয়েছিল ৩৮৮ কোটি ১০ লাখ ১৫ হাজার ৪৫১ টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে ওভারফ্লাই রাজস্ব বেড়েছে প্রায় ২৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা, যা প্রায় ৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

অন্যদিকে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে এ খাত থেকে মোট রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৮০৫ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৬৫ টাকা।বেবিচক-এর বিমান চলাচল ব্যবস্থাপনা বা এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট (এটিএম) বিভাগের সদস্য এয়ার কমোডর মো. নূর-ই-আলম বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা রয়েছে। মূল বিষয় হচ্ছে আইকাওর অনুমোদন এবং বর্তমান সময়ভিত্তিক সেপারেশনের পরিবর্তে দূরত্বভিত্তিক সেপারেশন চালু করা।

বিস্তারিত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সময়ের ভিত্তিতে উড়োজাহাজের মধ্যে সেপারেশন দিয়ে থাকে। এটি দূরত্বের ভিত্তিতে করা গেলে একই সময়ে আরও বেশি উড়োজাহাজকে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া সম্ভব হবে। এ জন্য প্রথমে ভারতের সঙ্গে এবং পরবর্তীতে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করতে হবে। তাদের সম্মতি পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান সংস্থার (আইসিএও) ব্যাংকক আঞ্চলিক কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।

মো. নূর-ই-আলম মতে, পুরো প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিকভাবে এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। আইসিএও’র অনুমোদন পাওয়ার পরদিন থেকেই নতুন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

তবে তার আগেই প্রয়োজনীয় জনবলকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই প্রশিক্ষণ বাংলাদেশে নেই; বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিতে হয়। নতুন রাডার ব্যবস্থা পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ দক্ষ জনবল।

বেবিচকের ওই কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে প্রায় ৫০ জন কন্ট্রোলার রয়েছে। তবে রাডারভিত্তিক অ্যাপ্রোচ ও এরিয়া কন্ট্রোল চালু করতে হলে বর্তমানের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক কন্ট্রোলার প্রয়োজন হবে। অন্যদিকে কর্মরত কন্ট্রোলারদের মধ্যে কেউ সারফেস রুম কন্ট্রোলে, কেউ টাওয়ারে, কেউ অ্যাপ্রোচে, আবার কেউ এরিয়া কন্ট্রোলে প্রশিক্ষিত। কেউ কেউ আবার এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রশিক্ষিত। তবে চার ক্ষেত্রে দক্ষ এমন কন্ট্রোলারের সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

এ প্রসঙ্গে এভিয়েশন বিশ্লেষক এবং দ্য বাংলাদেশ মনিটর-এর সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, দেশীয় এয়ারলাইনগুলোর আর্থিক সংকট, অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী চাহিদা, জ্বালানি ব্যয়, বিমানবন্দর ব্যবহার ফি, নেভিগেশন চার্জ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের প্রভাব- সবকিছুই এই মুহুর্তে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

রাজস্ব কয়েক গুণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় বিলিং ব্যবস্থাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বেবিচকের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, বর্তমান বিলিং ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় নয়। কিছু তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া গেলেও পরে তা ম্যানুয়ালি খাতায় লিখে আবার সিস্টেমে তুলে ইনভয়েস তৈরি করতে হয়। এতে তথ্য বাদ পড়ার বা হিসাবের ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। নতুন এটিসি সিস্টেমকে বিলিং ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি সমন্বিত করা গেলে উড়োজাহাজ চলাচলের তথ্য থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল তৈরি করা সম্ভব হবে।

বিষয়টি নিয়ে বেবিচকের আইটি বিভাগ কাজ করছে এবং নতুন ব্যবস্থার জন্য ভেন্ডর খোঁজা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। পুরো ব্যবস্থা ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় হলে বিল দ্রুত তৈরি হবে, কোনো অর্থ বাদ পড়ার সম্ভাবনা কমবে এবং প্রকৃত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা আরো সহজ হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন শুধু আকাশসীমা দিয়ে কত উড়োজাহাজ যাচ্ছে কেবলমাত্র সেই হিসাব বিবেচনায় না নিয়ে বরং বাংলাদেশ তার আকাশসীমার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কতটা কাজে লাগাতে পারছে সেই ভাবনাই জরুরি।