৪ দিনে সুদানে ড্রোন হামলায় ১৬০ জনের বেশি নিহত
গত শুক্রবার থেকে ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় সুদানে ১৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। চিকিৎসাকর্মী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আল জাজিরা।
সবশেষ সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানী খার্তুমে ড্রোন হামলায় তিন শিশু নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন ইমার্জেন্সি লইয়ার্স। এ ছাড়া শুক্রবার থেকে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় বিভিন্ন এলাকায় ড্রোন হামলায় ১৬০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
হামলাগুলোর জন্য আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) এবং সরকারি বাহিনী উভয় পক্ষকেই দায়ী করা হয়েছে। ২০২৩ সাল থেকে তারা সংঘাতে লিপ্ত।
তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ড্রোনের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিও বাড়ছে।সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাটি ঘটে রোববার সন্ধ্যায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় পশ্চিম কর্দোফান রাজ্যের আরএসএফ-নিয়ন্ত্রিত আল-দিবাব শহরের কাছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও চিকিৎসাকর্মীরা জানান, বাজারের দিন শেষে বাড়ি ফেরার যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন গ্রামবাসীরা। এ সময় একটি পরিবহনকেন্দ্রে ড্রোন হামলা চালানো হলে ৮০ জন নিহত হন।
এ ঘটনায় আহত ৪৭ জনকে কাছের আল-মুজলাদ শহরে নেওয়া হয়। পরে তাদের মধ্যে ৩০ জন মারা যান বলে এএফপিকে জানিয়েছেন একজন চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র।
আরএসএফের স্বঘোষিত প্রশাসন তাসিস এবং ইমার্জেন্সি লইয়ার্স এ হামলার জন্য সুদানের সেনাবাহিনীকে দায়ী করেছে।
পূর্ব সুদানের গাদারেফ রাজ্যে আতবারা ও সেটিট বাঁধ লক্ষ্য করে আরএসএফের কয়েকটি ড্রোন হামলার চেষ্টা চালায়। রোববার দেশটির এক সামরিক সূত্র জানায়, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ড্রোনগুলো প্রতিহত করেছে। বাঁধ দুটি রাজধানী খার্তুম থেকে প্রায় ৪২০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি আরএসএফ।
সোমবার ভোরে দক্ষিণ দারফুরের রাজধানী ও আরএসএফের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নিয়ালায় আরেকটি ড্রোন হামলা হয়। চিকিৎসা ও আরএসএফ সূত্রের তথ্যমতে, এতে সাতজন আরএসএফ কর্মকর্তাসহ ১৭ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন।
শুক্রবার ইথিওপিয়া সীমান্তবর্তী সুদানের ব্লু নাইল প্রদেশে বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি সমাবেশে আরএসএফের ড্রোন হামলায় ৪১ জন নিহত হন বলে জানিয়েছে ইমার্জেন্সি লইয়ার্স। সংগঠনটি এ ঘটনাকে মানবিক বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করে হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
সোমবার এসব প্রাণঘাতী হামলার নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক সাংবাদিকদের বলেন, দেশজুড়ে অব্যাহত প্রাণঘাতী ড্রোন হামলায় আমরা উদ্বিগ্ন। এসব হামলায় শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবাব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
নিহত অন্তত ৫৯ হাজার
সুদানে বর্তমান যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের এপ্রিলে। দেশটির সামরিক নেতা আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং আরএসএফপ্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালু, যিনি হেমেদতি নামে পরিচিত, আধাসামরিক বাহিনীকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এরপর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
জুনে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অনুপস্থিতিতে হেমেদতিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
চতুর্থ বছরে গড়ানো এ সংঘাতে অন্তত ৫৯ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এসিএলইডি। তবে সহায়তা সংস্থাগুলোর ধারণা, প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও বেশি।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, সংঘাতের কারণে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে দেশটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটগুলোর একটি তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করেছে সহায়তা সংস্থাগুলো।
জাতিসংঘের হিসাবে, চলতি বছর সুদানে ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের জরুরি খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন। তাদের মধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু। এ ছাড়া আনুমানিক ৮ লাখ ২৫ হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে।
শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে মানবিক যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিতে এবং সুদানের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পরিধি বাড়াতে আহ্বান জানিয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণের বিরোধিতা করেছে চীন ও রাশিয়া।