শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
ONP24
ব্রেকিং
আন্তর্জাতিক

১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড, দেখানো হবে সরাসরি

মোহাম্মদ খাইরুল আমিন • 09 অক্টোবর 2026, 11:17 দুপুর • 4 বার পঠিত
১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড, দেখানো হবে সরাসরি

২০০৯ সালে টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে বন্দুক হামলা চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যার দায়ে সাবেক মার্কিন সামরিক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিডাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে।

এই পুরো প্রক্রিয়াটি ইন্টারনেটে সরাসরি সম্প্রচার (লাইভস্ট্রিম) করার ‘নজিরবিহীন’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সদরদপ্তর পেন্টাগন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, “এটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। বিস্তারিত তথ্য পরে জানানো হবে।”

১৯৪৫ সালের পর এই প্রথম মার্কিন সামরিক বাহিনী ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে। আর কোনও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সরাসরি সম্প্রচারের এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তো বটেই, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও এক নজিরবিহীন ঘটনা।

আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের সেই ফোর্ট হুড ঘাঁটিতেই হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে, যেখানকার একটি চিকিৎসা কেন্দ্রে তিনি ২০০৯ সালে হামলা চালিয়েছিলেন।

মূল ঘটনার বার (বৃহস্পতিবার), সময় (দুপুর ১টা) এবং স্থান হুবহু মিলিয়ে এই সময় নির্ধারণের সিদ্ধান্তকে এক সাক্ষাৎকারে ‘দ্বিধাহীন ও অত্যন্ত স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত’ বলে বর্ণনা করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী পিট হেগসেথ।

হেগসেথ এক্সে দেওয়া পোস্টে লাইভস্ট্রিমের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “আমরা নিশ্চিত করব যেন সাধারণ মানুষ এটি প্রকাশ্যে দেখতে পায়। কারণ এ ধরনের জঘন্য অপরাধের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা মানুষের জানা প্রয়োজন।”

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে হাসানের কোনো শেষ ইচ্ছা আছে কি না, জানতে চাইলে হেগসেথ বলেন, “তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমরা ৩ ডিসেম্বরেই তার মুখোমুখি হব।”

মার্কিন সামরিক আইন অনুযায়ী ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে দেশের প্রেসিডেন্টের অনুমোদন লাগে। পেন্টাগন সোমবার জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর সুপারিশের ভিত্তিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এতে অনুমোদন দিয়েছেন।

তবে হোয়াইট হাউজ ট্রাম্পের লাইভস্ট্রিম সমর্থনের বিষয়ে মন্তব্য না করে পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছে। অতীতে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো আদালতে মৃত্যুদণ্ড সম্প্রচারের আবেদন করলেও বিচার বিভাগ তা নাকচ করে দেয়।

মৃত্যু বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের কোথাও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর সরাসরি সম্প্রচারের নজির নেই। কেবল ইরান ও তালেবানশাসিত আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোতে জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর শ্বেতাঙ্গ জনতার বেআইনি বিচারবহির্ভূত সহিংসতা (লিঞ্চিং) প্রকাশ্যভাবে হয়ে থাকলেও, আইনিভাবে স্বীকৃত সর্বশেষ জনসমক্ষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৩৬ সালে।

তখন এক শ্বেতাঙ্গ নারীকে ধর্ষণের দায়ে দণ্ডিত এক কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের ফাঁসি দেখতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিল।

ইয়েল ল স্কুলের সামরিক আইন বিশেষজ্ঞ ইউজিন ফিদেল এই সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনাকে “অত্যন্ত, অত্যন্ত অদ্ভুত” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

তিনি জানান, হাসানের মৃত্যুদন্ড কার্যকরের প্রকাশ্য সম্প্রচার ঠেকাতে ফেডারেল আদালতে মামলা করতে হবে।

ফিদেল আরও বলেন, “মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট আগে কখনো এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়নি। বর্তমান সুপ্রিম কোর্ট ১৭৯০ সালের পুরনো আইন টেনে যদি বলে ‘তখন এটি ঠিক ছিল, তাই এখনো সমস্যা নেই’, তবে তা বেশ দেখার বিষয় হবে।”

ইতিহাসবিদ জোনাথন লুরি প্রশ্ন তুলে বলেন, “এর মূল উদ্দেশ্যটা কী? কারাই বা এরকম দৃশ্য দেখতে চাইবে?”

মৃত্যুদণ্ডবিরোধী সংগঠন ‘ডেথ পেনাল্টি অ্যাকশন’ ও ‘ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টার’ জানায়, মার্কিন সামরিক বাহিনীতে ১৯৬১ সালে ফাঁসির মাধ্যমে শেষ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আর ফায়ারিং স্কোয়াডের ব্যবহার হয়েছিল ১৯৪৫ সালে।

বর্তমানে ৫৬ বছর বয়সী নিডাল হাসানকে আফগানিস্তানে মোতায়েন করার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০০৯ সালে তিনি ফোর্ট হুড ঘাঁটিতে লেজার সাইটযুক্ত পিস্তল নিয়ে হামলা চালান।

২০১৩ সালের অগাস্টে সামরিক আদালতের বিচারে ৪৫টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়ে তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। গ্রেপ্তারের সময় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হয়ে তিনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন এবং বর্তমানে হুইলচেয়ার বন্দি।

সম্প্রতি টেনেসিতে ক্রিস্টা পাইক নামে এক নারীর প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। ইনজেকশন প্রয়োগ ব্যর্থ হওয়ায় ওই নারী মারা যাননি।

তার আইনজীবীরা বুধবারে জানান, হাসপাতালে জ্ঞান ফেরার পর তিনি ‘ক্রুদ্ধ ও বিভ্রান্ত’ হয়ে পড়েন এবং এখনও হাসপাতালের বেডে তিনি শিকল পরা অবস্থায় রয়েছেন।

ইনজেকশনের ওষুধ সংকটের কারণে ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি ফায়ারিং স্কোয়াড, বিদ্যুতায়িত চেয়ার ও বিষাক্ত গ্যাসের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সুযোগ যুক্ত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত পাঁচটি রাজ্যে ফায়ারিং স্কোয়াডের আইনি বিধান রয়েছে, যার মধ্যে ২০২৫ সালে সাউথ ক্যারোলাইনায় ১৫ বছর পর মার্কিন ইতিহাসে প্রথম এমন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।