ইসলামের দৃষ্টিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় বট ও অটোমেশনের অপব্যবহার
ডিজিটাল দুনিয়ায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল কিংবা নিজের পক্ষে প্রচারণা চালানোর একটি মাধ্যম হলো বট অ্যাকাউন্ট বা বট বাহিনী। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, প্রভাবশালী ব্যক্তি, শিল্পগোষ্ঠী ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিমূলক জনমত তৈরির জন্য এর ব্যবহার বেশি হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে বট বা অটোমেশন ব্যবহার জায়েজ হবে কিনা, সেই সিদ্ধান্তে জেতে হলে আগে বুঝতে হবে বট কী? নিম্নে বটের পরিচিতি ও তার ইতিবাচক ও নেতিবাচক ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
বট কী? : ‘বট’ শব্দটি এসেছে ‘রোবট’ থেকে। ইন্টারনেট বট হলো একটি স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার প্রোগ্রাম যা ইন্টারনেটে নির্দিষ্ট কাজ করে থাকে।
এটা কী কাজে ব্যবহূত হয় : এর ব্যবহার নির্ভর করে তার ব্যবহারকারীর উপর। ব্যবসা, গ্রাহকসেবা, তথ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা নিয়মিত পোস্ট প্রকাশের মতো বহু বৈধ কাজে বট ব্যবহূত হয়। আবার অনেকে ভুয়া জনমত তৈরি, কারো চরিত্র হনন, মিথ্যা ছড়ানোর মতো জঘন্য কাজেও এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে।
দুঃখজনক বিষয় হলো, মানুষের কাজ সহজ করার জন্য সৃষ্ট এই প্রযুক্তির অপব্যবহারই বেশি দেখা যায়। বর্তমানে সোশ্যাল মিডিয়ায় বট ও ফোন ফার্মিং প্রযুক্তির ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে। ভুয়া ফলোয়ার বৃদ্ধি, মিথ্যা রিভিউ প্রদান, কৃত্রিমভাবে ট্রেন্ড তৈরি, টাকার বিনিময়ে গালিগালাজ, গুজব ছড়ানো, চরিত্রহনন, প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার কিংবা জনমত প্রভাবিত করার জন্য হাজার হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালিত হচ্ছে। ইসলামের আলোকে এসব কর্মকাণ্ড গুরুতর নৈতিক অপরাধ।
ভুয়া জনপ্রিয়তা প্রদর্শনে প্রতারণা : অনেকেই অর্থের বিনিময়ে হাজার হাজার ফলোয়ার, লাইক ও কমেন্ট সংগ্রহ করে নিজেদের বাস্তবতার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় হিসেবে উপস্থাপন করেন। এটি বাহ্যিক ভাবে খুব হালকা মনে হলেও সরাসরি প্রতারণার শামিল। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশিয়ে দিও না এবং জেনেবুঝে হককে গোপন করো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৪২)। ভুয়া লাইক কমেন্ট শেয়ার দিয়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর অপচেষ্টাও হক গোপন করে প্রতারণার শামিল। আর প্রতারকের ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮৪)
ভুয়া রিভিউ ও মিথ্যা সাক্ষ্য : বট ব্যবহার করে পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে মিথ্যা প্রশংসা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে নেতিবাচক মন্তব্য প্রচার করা বর্তমানে সাধারণ ঘটনা। এটা কম্পানির পক্ষে বা বিপক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্যের শামিল। অথচ ইসলাম মিথ্যা সাক্ষ্যকে কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মিথ্যা কথাকে পরিহার করো।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৩০)
তাফসিরবিদদের মতে, মিথ্যা সাক্ষ্যও মিথ্যার কথার শামিল।
গালিগালাজ ও চরিত্রহনন : অনেক বট নেটওয়ার্ক অর্থের বিনিময়ে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপমানজনক প্রচারণা চালায়। কমেন্টে গিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগাল দেয়। এটি ইসলামে নিষিদ্ধ। এই কাজে ব্যক্তিদের অভিশাপ দিয়ে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘দুর্ভোগ প্রত্যেকের জন্য, যে সামনে নিন্দাকারী ও পেছনে গীবতকারী।’ (সুরা হুমাযা, আয়াত : ১)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মুসলিমকে গালি দেওয়া ফাসেকি, তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৮)
গুজব ও ভুয়া জনমত সৃষ্টি : সোশ্যাল মিডিয়ায় বট ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে জনমত গঠন করা এবং বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা আজ একটি বড় সমস্যা। উপরে দেওয়া তথ্য-প্রমাণ দ্বারা বোঝা যায়, এই কাজগুলো করা যেমন হারাম। যারা এগুলো যাচাই বাছাই ছাড়া সমর্থন করবে, নিজেরাও শেয়ার করবে, তারাও সেই একই পাপে লিপ্ত হবে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে তা-ই প্রচার করে।’ (মুসলিম, হাদিস: ৭)
এই হাদিস দ্বারা আরো প্রমাণিত হয়, অসত্ উদ্দেশ্যে বট পরিচালনাকারী, অর্থদাতা এবং অপপ্রচারে অংশগ্রহণকারী—সকলেই অন্যায়ের কাজে সহযোগিতাকারী হিসেবে গণ্য হতে পারে, যা আল্লাহ নিষিদ্ধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ আজাবদানে কঠোর।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত :২)
অতএব, কোনো মুমিনের জন্য বট ও অটোমেশন ইত্যাদির সাহায্য নিয়ে মিথ্যা প্রচার, প্রতারণা, ভুয়া জনপ্রিয়তা সৃষ্টি, চরিত্রহনন, গুজব ছড়ানো বা মানুষের মতামতকে কৃত্রিমভাবে প্রভাবিত করার হারাম। বাস্তব জীবন সত্য ও ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখা যেমন একজন মুসলমানের দায়িত্ব, তেমনি ডিজিটাল জগতেও সততা, আমানতদারি এবং আল্লাহভীতির পরিচয় দেওয়া তাদের কর্তব্য।